পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা এখন আর শুধুই ইতিহাসের পাতায় নেই। যুদ্ধ, সংকট ও বৈশ্বিক উত্তেজনার পটভূমিতে পারমাণবিক অস্ত্র আবারও উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI) সম্প্রতি এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৪ সাল শেষে বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সবাই তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আরও শক্তিশালী করেছে। ঠান্ডা যুদ্ধের পর এতটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি আর কখনো তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন গবেষকরা।
পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ কি ইতিহাস হয়ে গেল?
বিগত কয়েক দশক ধরে বিশ্বের পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো ‘নিরস্ত্রীকরণের’ নীতি নিয়ে আলোচনায় বসেছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই আলোচনার ফল এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। SIPRI জানায়, ২০২৪ সালের শেষে বিশ্বের সক্রিয় পারমাণবিক ওয়ারহেড সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯,৬১৪টি, যা আগের বছরের তুলনায় ০.৩% বেশি। যদি অবসরে যাওয়া অস্ত্রও ধরা হয়, তবে মোট সংখ্যা ১২,২৪১।
আরো ভয়ংকর খবর হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র কমানো নিয়ে যে সংলাপ একসময় চলত, তা এখন কার্যত বন্ধ। এর মানে হলো, দুই পরাশক্তির অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ আলোচনা স্থবির হয়ে আছে—এবং সেই শূন্যতা পুঁজি করে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।
চীন: পরমাণু শক্তির নতুন দানব?
চীনের পারমাণবিক শক্তি সম্প্রসারণের গতি এখন বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত। SIPRI-এর মতে, চীন এখন প্রতিবছর গড়ে ১০০টি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের মোট ওয়ারহেডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০০, যা বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
চীন বর্তমানে তিনটি বড় অঞ্চলে নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সিলো তৈরি করছে—উত্তরের সমতল ভূমিতে ও মধ্য-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায়। তবে অধিকাংশ চীনা পারমাণবিক ওয়ারহেড এখনো তাদের লঞ্চার বা নিক্ষেপ-যন্ত্র থেকে আলাদা করে রাখা আছে।

এখানেই শেষ নয়। চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশ। ২০৩০-এর মধ্যে চীনের ICBM-এর সংখ্যা হয়তো রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের সমান হয়ে যেতে পারে, যদিও মোট অস্ত্রসংখ্যায় এখনো তারা পিছিয়ে থাকবে।
তবে তাইওয়ানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন-আমেরিকার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক আলোচনাও এখন পুরোপুরি অচল।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া: পুরনো দুই দানবের নতুন প্রস্তুতি
এখনো পর্যন্ত বিশ্বের ৯০ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্র এই দুই দেশের হাতে। ঠান্ডা যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় আজও তাদের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা থেমে নেই।
দুই দেশই তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়নের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে। কিন্তু এক বিপদ ঘনিয়ে আসছে—২০১০ সালের ‘New START Treaty’ যেটি কৌশলগত অস্ত্র সীমিত রাখার জন্য ছিল, সেটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে। নতুন কোনো চুক্তি না হলে পারমাণবিক অস্ত্র সংখ্যা হঠাৎ করেই বেড়ে যেতে পারে।
- রাশিয়া: তাদের ‘নিউ সারমাত’ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষায় ব্যর্থতা এসেছে। অন্যান্য আধুনিকায়ন প্রকল্পও ধীরগতিতে চলছে। তবে প্রযুক্তিগত সমস্যার মধ্যেও রাশিয়া পারমাণবিক ক্ষমতা ধরে রাখার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

- যুক্তরাষ্ট্র: চীনের অগ্রগতির চাপে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে রাজনীতিকদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের ফাঁকা লঞ্চারগুলো পুনরায় সক্রিয়, নন-স্ট্র্যাটেজিক ওয়ারহেড বাড়ানো, এবং অস্ত্র মোতায়েন বৃদ্ধি করতে পারে।

ইউরোপে অস্ত্র প্রতিযোগিতা:
ইউরোপে পারমাণবিক শক্তির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ফ্রান্স, যাদের হাতে রয়েছে ২৯০টি ওয়ারহেড—প্রায় সবই যুদ্ধ প্রস্তুত।
ফ্রান্স তৃতীয় প্রজন্মের সাবমেরিন-নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও নতুন ক্রুজ মিসাইল তৈরির প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ঘোষণা দিয়েছে, তারা ৪টি নতুন পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করবে এবং আকুস (AUKUS) চুক্তির আওতায় আরও ১২টি সাবমেরিন তৈরিতে ১৫ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করছে।
যুক্তরাজ্যের বর্তমান অস্ত্র সংখ্যা ২২৫টি, যদিও গত বছর এতে বাড়তি কোনো সংযোজন হয়নি। তবে দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক হুমকির প্রেক্ষিতে সরকার এখন নতুন করে সামরিক বিনিয়োগে আগ্রহী।

কে কবে পারমাণবিক শক্তিধর হল?
বিশ্বে এখন ৯টি দেশ প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা স্বীকার করেছে:
-
যুক্তরাষ্ট্র (১৯৪৫)
-
রাশিয়া/সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৪৯)
-
যুক্তরাজ্য (১৯৫২)
-
ফ্রান্স (১৯৬০)
-
চীন (১৯৬৪)
-
ভারত (১৯৭৪)
-
পাকিস্তান (১৯৯৮)
-
উত্তর কোরিয়া (২০০৬)
-
ইসরায়েল – কখনো প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় তাদের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বিতর্কিত ইতিহাস
- ইরান – দাবি করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, কিন্তু ২০২৩ সালে তারা ৬০% পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে—যা অস্ত্র-উপযোগী ৯০% এর খুব কাছাকাছি। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করে ইরান এখনও বোমা তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি।
- দক্ষিণ আফ্রিকা – একসময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছিল (১৯৭৯), কিন্তু পরে সব ধ্বংস করে ১৯৯১ সালে NPT-তে যোগ দেয়।
- ইউক্রেন, বেলারুশ ও কাজাখস্তান – সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর পারমাণবিক অস্ত্র পেয়েছিল, কিন্তু ১৯৯২ সালে সবকিছু রাশিয়াকে হস্তান্তর করে দেয়।
বিশ্ব আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আশা যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
পুরনো প্রতিযোগিতা ফিরে এসেছে, নতুন শক্তিগুলো নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলছে, আর বিশ্বনেতাদের মধ্যে বিশ্বাস ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে।
এক সময় যে ‘পারমাণবিক অস্ত্র’ ছিল শেষ বিকল্প, এখন তা হয়ে উঠছে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের নিয়মিত উপায়। এই বাস্তবতা আমাদের সবাইকে ভাবতে বাধ্য করে—মানব সভ্যতা কি নিজের হাতে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনছে?

