চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এ নিয়ে চলছে চুক্তির খসড়া তৈরির কাজ। তবে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নয়, বরং সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। শুধু এনসিটি নয়, ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনালের একটি অংশও ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে বন্দরে অপারেটর নিয়োগে ল্যান্ডলর্ড মডেল ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রই বেশি প্রচলিত। অথচ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই কনটেইনার টার্মিনাল সরাসরি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এতে ল্যান্ডলর্ড মডেলের পূর্ণ প্রয়োগ ঘটছে না। কারণ এনসিটিতে ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ করে আধুনিক যন্ত্রপাতি বসিয়েছে।
২০০৮ সালে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বিদেশি অপারেটর আনার চেষ্টা হয়েছিল। ২০০৯ সালে চারটি বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানও বাছাই করা হয় কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের হস্তক্ষেপের অভিযোগে প্রক্রিয়া বাতিল হয়। পরে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার নতুন করে উদ্যোগ নেয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও সে প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এখন এনসিটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল)।
চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, সিডিডিএলের পরিচালনায় এনসিটির পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক। আড়াই মাসে কনটেইনার ওঠা-নামা বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। জাহাজের অপেক্ষার সময় কমেছে। কার্যকারিতা বেড়েছে। তবে তার মতে, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের চাপ মোকাবেলায় বিদেশি অপারেটরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো জরুরি।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনও মনে করেন, আন্তর্জাতিক অপারেটর না আনলে চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে শতাধিক বন্দর চালায়। অথচ ১৪০ বছরের পুরনো চট্টগ্রাম বন্দর এখনো বিশ্বপরিচিত নয়।
অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক মহল বলছে, এনসিটিতে ইতোমধ্যেই আড়াই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করা হয়েছে। যন্ত্রপাতি কার্যকর থাকবে আরো দুই দশকের বেশি সময়। নতুন কোনো বড় বিনিয়োগের সুযোগ নেই। তাই সাজানো-গোছানো একটি লাভজনক টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়ার যৌক্তিকতা নেই।
বন্দর খাতের উদ্যোক্তা শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, নতুন টার্মিনাল বিদেশিদের দেয়া নিয়ে আপত্তি নেই কিন্তু এনসিটি জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয়া উচিত নয়। একইভাবে আমিরুল হক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সীকম গ্রুপ বলেন, দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা হলে দেশি-বিদেশি যৌথ অপারেটর আসতে পারত, প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগও তৈরি হতো।
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে—নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এবং রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)। এর মধ্যে এনসিটি ২০০৭ সালে আংশিক এবং ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়।

