পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে লাখো মানুষ। প্রতি বছরের মতো এবারও নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার সেই চিরচেনা দৃশ্য চোখে পড়ছে দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে। তবে এই যাত্রা যেমন আবেগের, তেমনি অনেকের জন্য হয়ে উঠছে ভোগান্তিরও আরেক নাম।
ঢাকার সাভার এলাকা এখন যেন সেই ভোগান্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ সন্ধ্যা নামতেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, নবীনগর-চন্দ্রা সড়ক এবং আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া সড়কে ঘরমুখো মানুষের চাপ হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। এর ফলে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়ে পুরো এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
বিশেষ করে নবীনগর-চন্দ্রা সড়কের পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে নাজুক। প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের কারণে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। যারা স্বাভাবিক সময়ে কয়েক মিনিটে এই পথ অতিক্রম করতে পারতেন, তাদের এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে সড়কের ওপর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গাজীপুরের চন্দ্রা পয়েন্টে সৃষ্ট জটই পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চন্দ্রার মুখে গিয়ে একাধিক লেনের গাড়ি একটি লেনে মিলিত হওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ জ্যাম এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের জিরানি, কবিরপুর এবং বাড়ইপাড়া এলাকায়। এসব এলাকায় গাড়ির দীর্ঘ সারি দাঁড়িয়ে আছে, যেন থমকে গেছে পুরো যাত্রাপথ।
চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সমস্যার মূল কারণ সড়কের নকশাগত ত্রুটি। তাদের মতে, কয়েক লেন থেকে হঠাৎ একটি লেনে নামার কারণে গাড়ির চাপ সামলানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে যে পথ মাত্র ১০ মিনিটে পাড়ি দেওয়ার কথা, সেটি এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিচ্ছে।
এদিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর, সাভার বাজার এবং গেন্ডা এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। যাত্রী ও যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে এসব এলাকাতেও ধীরগতিতে চলছে যান চলাচল।
যাত্রীরা শুধু যানজটেই আটকে নেই, তাদের অভিযোগের তালিকায় যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়টিও। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের উপস্থিতিতেই পরিবহন শ্রমিকরা কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দাবি করছেন।
বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাড়া নিয়ে প্রায় প্রতিটি বাসেই দর কষাকষি চলছে। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে তাদের অভিযোগ। অনেকেই বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিয়েই যাত্রা করছেন, কারণ ঈদের আগে যেকোনোভাবে বাড়ি পৌঁছানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করছেন। তারা যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, সড়ক পরিষ্কার রাখা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সাভার হাইওয়ে থানার ইনচার্জ শেখ শাজাহান জানিয়েছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে সড়কে গাড়ির সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, চন্দ্রা এলাকায় কিছুটা যানজট থাকলেও অন্যান্য জায়গায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভোগান্তি কমাতে হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত তদারকি করছে বলেও তিনি জানান।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঈদযাত্রা শুরু হলেও সেই যাত্রা এখন অনেকের জন্য ধৈর্যের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবারে ফিরে যাওয়ার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে দীর্ঘ অপেক্ষা, ক্লান্তি এবং ভোগান্তির গল্প।
তবুও মানুষ থেমে নেই। কারণ ঈদ মানেই ঘরে ফেরা, প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়া। আর সেই টানই সব কষ্টকে ছাপিয়ে মানুষকে আবারও পথে নামতে বাধ্য করছে।

