মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার জরুরি ভিত্তিতে ৩ লাখ টন ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আসন্ন এপ্রিল মাসের চাহিদা নিশ্চিত করতেই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ১২ মার্চ অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করে। ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দ্রুত এই ক্রয় কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়েছে।
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঝুঁকিতে রয়েছে।
এতে নিয়মিত সরবরাহকারীরা সময়মতো পণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে দেশের পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চলমান বোরো সেচ মৌসুমে ডিজেলের ঘাটতি বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন-১) এ কে এম ফজলুল হক জানান, ইতোমধ্যে সরবরাহকারীদের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, এপ্রিলের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, দুবাইভিত্তিক পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন সরবরাহ করবে ১ লাখ টন ডিজেল। বাকি ২ লাখ টন দেবে যুক্তরাষ্ট্রের এঅ্যান্ডএ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। প্রথম চালান আগামী ২৭ মার্চের মধ্যে দেশে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়। পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই জ্বালানির ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি।
এই ক্রয়ে দুটি সরবরাহকারীর মূল্য কাঠামো ভিন্ন। পেট্রোগ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারভিত্তিক ‘প্ল্যাটস’ দরে ডিজেল সরবরাহ করবে। অন্যদিকে এঅ্যান্ডএ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস প্রতি ব্যারেল ৭৫ ডলারে নির্দিষ্ট মূল্য প্রস্তাব করেছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৪৩ থেকে ১৭২ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা সংঘাতের আগে ছিল ৮৫ থেকে ৯০ ডলার। সেই তুলনায় ৭৫ ডলারের প্রস্তাবটি বেশ কম।
তবে এত কম দামে সরবরাহ নিয়ে কিছুটা সংশয়ও রয়েছে। জ্বালানি সচিবের ভাষ্য, সরবরাহকারীরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য দিতে পারবে কি না, তা পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, এই ডিজেল সম্ভবত রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদিত, যা তৃতীয় কোনো দেশে পরিশোধিত হয়ে আসতে পারে। এতে সরবরাহ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকটে প্রচলিত সরবরাহ ব্যবস্থা অস্থির হয়ে পড়ায় সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এই পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণত মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ওমান ও কুয়েত থেকে জ্বালানি আমদানি করে। তবে এসব দেশের অনেক সরবরাহই হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে দেশে জ্বালানি রেশনিং তুলে নেওয়া এবং ঈদুল ফিতর সামনে থাকায় চাহিদা আরও বাড়ছে। এতে সামান্য সরবরাহ বিঘ্নও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। যদিও সরাসরি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কিছু ঝুঁকি থাকে, তবুও জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সচিব জানান, এই ক্রয়ে কোনো অতিরিক্ত প্রিমিয়াম যোগ করা হয়নি। বরং দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির তুলনায় কম দামে ডিজেল সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার লক্ষণ না থাকায় ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ, মূল্য ও পরিবহন ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

