ঈদুল ফিতর সামনে এলেই রাজধানী ছেড়ে বাড়ির পথে ছুটে যায় লাখো মানুষ। নাড়ির টানে এই ঘরে ফেরার যাত্রা যেন বাঙালির এক আবেগের নাম। কিন্তু সেই আনন্দের পথেই এবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাড়তি ভাড়া।
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাস টার্মিনাল গাবতলীতে এখন ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বুধবার, ১৮ মার্চ সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো টার্মিনালজুড়ে যেন মানুষের ঢল নেমেছে। কেউ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন বাস ধরতে, কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিটের অপেক্ষায়, আবার কেউ দীর্ঘ সময় বসে আছেন শুধু একটি সিট পাওয়ার আশায়।
তবে এই ভিড়ের মাঝেই সবচেয়ে বড় অভিযোগ—টিকিটের দাম। অনলাইনে আগে থেকে টিকিট না কাটা যাত্রীরা এখন কাউন্টারে এসে পড়ছেন চরম বিপাকে। প্রায় সবাইকেই দিতে হচ্ছে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি টাকা।
রাজবাড়ীগামী যাত্রী মো. অন্তর জানান, সাধারণ সময়ে গাবতলী থেকে রাজবাড়ীর ভাড়া ৩৯০ টাকা। কিন্তু ঈদের এই সময়ে তাকে গুনতে হয়েছে ৭০০ টাকা। তার ভাষায়, “আমি লাস্ট টিকিটটা কেটেছি। যেহেতু আর টিকিট ছিল না, আর বাড়ি যেতেই হবে, তাই কিছু বলিনি।”
একই অভিজ্ঞতা পাংশাগামী যাত্রী মো. কাউছারেরও। তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ৪০০ টাকায় বাড়ি যাওয়া গেলেও এখন ৭০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। তার মতে, প্রায় সব বাসেই একই অবস্থা।
মাগুরাগামী যাত্রী ইব্রাহিমও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি জানান, অন্য সময় ভাড়া থাকে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে, কিন্তু এখন সেটি বেড়ে ৭০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তার কথায়, “প্রতি ঈদেই এমন হয়। জানি বেশি ভাড়া দিতে হবে, তবুও যেতে হয়।”
এই চিত্র শুধু কয়েকজন যাত্রীর নয়, বরং গাবতলী টার্মিনালের প্রায় প্রতিটি কাউন্টারেই একই অভিযোগ শোনা গেছে। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়ায় টিকিট কিনছেন।
তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তাদের দাবি, তারা আসলে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন না, বরং বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়াই নিচ্ছেন।
সৌহার্দ্য পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার ইমরান বলেন, সাধারণ সময়ে তারা সরকারি ভাড়ার চেয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা কম রাখেন, যাতে যাত্রীরা সুবিধা পান। কিন্তু ঈদের সময় যখন নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হয়, তখন সেটিকে যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া মনে করছেন।
একই ধরনের বক্তব্য দেন সাকুরা পরিবহনের ম্যানেজার মো. আল আমিন। তিনি বলেন, “সরকারি চার্ট অনুযায়ী ভাড়া রাখলে সাধারণ সময়ে যাত্রী পাওয়া যায় না, তাই আমরা কম নিই। কিন্তু এখন সেই চার্ট অনুযায়ী ভাড়া নিলেই যাত্রীরা মনে করছেন বেশি নিচ্ছি।”
তবে যাত্রীরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাদের অভিযোগ, বাস্তবে যে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি এবং এটি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের আরও সক্রিয় ভূমিকা দরকার।
এই বিষয়ে গাবতলী টার্মিনালে দায়িত্বরত বিআরটিএ ভিজিল্যান্স টিমের সহকারী পরিচালক মইনুল হাসান জানান, এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়তি ভাড়ার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, প্রতিটি কাউন্টারে ভাড়ার চার্ট টানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী ভাড়া নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, টার্মিনালের বাইরে যদি কেউ অতিরিক্ত ভাড়া নেয়, তাহলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ঈদযাত্রা শুরু হলেও সেই যাত্রা অনেকের জন্য সহজ হচ্ছে না। টিকিট সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা আর বাড়তি ভাড়া—সব মিলিয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ যেন অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
তবুও মানুষ থেমে নেই। কারণ ঈদ মানেই পরিবারের কাছে ফেরা, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো। আর সেই টানেই সব কষ্ট মেনে নিয়েই ঘরমুখো মানুষ পাড়ি জমাচ্ছেন আপন ঠিকানায়।

