কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে আসন্ন ঈদুল ফিতরের জামাতকে কেন্দ্র করে সব ধরনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ এই ঈদ জামাতকে ঘিরে মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবারের মতো এবারও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে বৃহৎ ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৯৯তম ঈদ জামাত। ঈদের দিন সকাল ১০টায় নামাজ আদায় করা হবে। জামাতে ইমামতি করবেন কিশোরগঞ্জ শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ।
বিকল্প ইমাম হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন হয়বতনগর এ. ইউ. কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই। নিরাপত্তার স্বার্থে ঈদগাহে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মুসল্লিরা টুপি, জায়নামাজ ও মোবাইল ফোন ছাড়া অন্য কোনো সামগ্রী সঙ্গে নিতে পারবেন না। ছাতা বহন করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আজ বুধবার দুপুরে ঈদগাহ ময়দানের প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, র্যাব-১৪ ময়মনসিংহের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নাইমুল ইসলাম এবং পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, ঈদ জামাত আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়েছে। মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন বলেন, ২০১৬ সালের জঙ্গি হামলার পর থেকে শোলাকিয়া ঈদগাহে প্রতি বছরই বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হয়। এবারও চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ১১০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। ঈদগাহ ময়দান ও আশপাশ এলাকায় একাধিক চেকপোস্ট এবং পিকেট বসানো হয়েছে। ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে, যার চারটি ব্যবহার করবে পুলিশ এবং দুটি র্যাব।
তিনি আরও জানান, পুরো এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। পাশাপাশি চারটি ড্রোন ও ছয়টি ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হবে। নিরাপত্তায় থাকবে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল, সুইপিং টিম ও কুইক রেসপন্স টিম। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিম ও ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
র্যাব-১৪ এর অধিনায়ক নাইমুল ইসলাম বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্নাইপার টিম, ড্রোন ক্যামেরা এবং ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। র্যাব সদস্যরা ইউনিফর্মের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমানে কোনো ধরনের নিরাপত্তা হুমকির তথ্য নেই বলেও জানান তিনি।
ঈদগাহ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান মারুফ জানান, ঈদগাহ ময়দান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, রং করা এবং মুসল্লিদের জন্য অজু ও গোসলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে দূরদূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা স্বাচ্ছন্দ্যে নামাজ আদায় করতে পারেন। মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে ঈদের দিন সকাল ৮টায় কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রুটে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দু’টি বিশেষ ট্রেন চালানো হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৭ জুলাই শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ সদস্য, এক নারী এবং এক জঙ্গিসহ চারজন নিহত হন। ওই ঘটনায় আরও অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছিলেন। তবে সেই ঘটনার পরও ঐতিহ্যবাহী এই ঈদ জামাত আয়োজন বন্ধ হয়নি। কেবল করোনাভাইরাস মহামারির কারণে টানা দুই বছর এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি।
ইতিহাস অনুযায়ী, শোলাকিয়া ঈদগাহের যাত্রা শুরু হয় প্রায় ১৭৫০ সালে। পরে ১৮২৮ সালে এখানে প্রায় সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। সেই ঘটনা থেকেই এলাকাটি ‘সোয়া লাখিয়া’ নামে পরিচিতি পায়, যা পরে পরিবর্তিত হয়ে ‘শোলাকিয়া’ নামেই সুপরিচিত হয়ে ওঠে।

