বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় আবারও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ফিনল্যান্ড। টানা নবমবারের মতো এই অর্জন দেশটিকে বিশ্বজুড়ে সুখ ও জীবনমানের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এই তালিকায় রয়েছে ১৩৪তম অবস্থানে, যা গত বছরের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে।
শুক্রবার (২০ মার্চ) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট-২০২৬-এ এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ২০ মার্চ বিশ্ব সুখ দিবস উপলক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে এই প্রতিবেদন, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান ও সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করে র্যাংকিং নির্ধারণ করা হয়।
এই তালিকায় মোট ১৪৭টি দেশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা সন্তোষজনক নয়। এ অঞ্চলে বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে শুধু আফগানিস্তান, যার অবস্থান ১৪৩তম। অর্থাৎ আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশ এখনও নিচের দিকেই অবস্থান করছে।
বিশ্ব সুখ দিবসের ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সালের জুন মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসের স্বীকৃতি দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সুখ, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই উপলক্ষে প্রতিবছর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টার, জরিপ সংস্থা গ্যালাপ এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্ক যৌথভাবে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা, সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনযাপনের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, উদারতা এবং দুর্নীতি সম্পর্কে মানুষের ধারণা। এই বিষয়গুলোই মূলত একটি দেশের মানুষের সুখী হওয়ার মাত্রা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গ্যালাপের বিশ্বব্যাপী জরিপের মাধ্যমে ১৪০টির বেশি দেশের মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা তাদের জীবনের গত তিন বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সেই তথ্যের গড় হিসাব করেই নির্ধারণ করা হয় একটি দেশের সামগ্রিক সুখের অবস্থান। এবারের প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
শীর্ষ দশটি সুখী দেশের তালিকায় এবারও ইউরোপের দেশগুলোর আধিপত্য লক্ষ্য করা গেছে। ফিনল্যান্ডের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ডেনমার্ক, তৃতীয় স্থানে আইসল্যান্ড এবং চতুর্থ স্থানে সুইডেন। এরপর রয়েছে নেদারল্যান্ডস, কোস্টারিকা, নরওয়ে, ইসরায়েল, লুক্সেমবার্গ এবং মেক্সিকো।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব দেশের সাফল্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কম দুর্নীতি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং নাগরিকদের উচ্চমাত্রার স্বাধীনতা। মানুষ সেখানে শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, মানসিক ও সামাজিকভাবেও তুলনামূলক বেশি সন্তুষ্ট।
অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই সূচক একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও মানুষের জীবনমান, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত না হলে সামগ্রিক সুখের সূচকে উন্নতি করা কঠিন।
সব মিলিয়ে, ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট শুধু একটি তালিকা নয়—এটি একটি আয়না, যেখানে প্রতিটি দেশের বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয়। আর সেই আয়নায় বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করতে হলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানুষের সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

