ত্রিশ দিনের সিয়াম সাধনার পর শেষ হলো পবিত্র রমজান মাস। সংযম, আত্মশুদ্ধি আর ধৈর্যের এই দীর্ঘ পথচলার পর আবারও ফিরে এলো আনন্দের ঈদ। হিংসা-বিদ্বেষ, বিভাজন আর সংঘাত ভুলে শান্তি, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে শুরু হচ্ছে ঈদুল ফিতরের উৎসব। বাংলাদেশেও সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। এবারের মতো এবারও জাতীয় পর্যায়ের প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৮টায়। এখানে রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবেন—যা ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য ও সাম্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে জাতীয় ঈদগাহে এই প্রধান জামাতের আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সকাল ৯টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রস্তুতি থেকেই বোঝা যায়, ঈদের আনন্দকে নির্বিঘ্ন রাখতে কর্তৃপক্ষ কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।
ঈদের প্রধান জামাতে ইমামতির দায়িত্ব পালন করবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক। পাশাপাশি বিকল্প ইমাম হিসেবেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফাসসির ড. মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারীকে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও এই জামাতে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
জাতীয় ঈদগাহে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির একসঙ্গে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ নারী মুসল্লির জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। নারীদের জন্য পৃথক প্রবেশপথ, ওজুর ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসা সেবার জন্য মেডিকেল টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, কোনো ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কা নেই এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। জাতীয় ঈদগাহ ও আশপাশের এলাকায় সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হবে। প্রবেশপথগুলোতে থাকবে ব্যারিকেড, আর্চওয়ে এবং মেটাল ডিটেক্টর। এছাড়া পুলিশের পাশাপাশি বিশেষ বাহিনীর সদস্যরাও মোতায়েন থাকবেন।
জাতীয় ঈদগাহে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট গেট ব্যবহার করতে হবে এবং পুরো এলাকা জুড়ে থাকবে নিরাপত্তা তৎপরতা। ডগ স্কোয়াড ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের টিমও নিয়মিত তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সব মিলিয়ে নিরাপদ পরিবেশে ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমেও ঈদের পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে সকাল ৮টা, ৯টা, ১০টা এবং পৌনে ১১টায় এসব জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা সুবিধামতো সময়ে অংশ নিতে পারবেন।
জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজাতেও সকাল ৮টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে স্পিকার, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেবেন। এই আয়োজনও সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরেও কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ও প্রধান মসজিদগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কোথাও সকাল ৮টা, কোথাও সাড়ে ৮টা বা ৯টায় প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। আবহাওয়ার সম্ভাব্য প্রতিকূলতা মাথায় রেখে অনেক জায়গায় বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া মাঠেও ঈদের নামাজের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ১৮২৮ সালে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্যবাহী জামাত এবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৯৯তমবারের মতো। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এই জামাতে লাখো মুসল্লির সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেখানে ইমামতি করবেন বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।
ঈদকে ঘিরে শুধু নামাজের আয়োজনই নয়, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্যও নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। দেশের হাসপাতাল, কারাগার, শিশু সদন, বৃদ্ধ নিবাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে সেখানকার মানুষও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন।
এছাড়া সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ঈদের দিন বিশেষ বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাজধানীর শিশু পার্ক, জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লাসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে তারা বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারবে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতেও আয়োজন করা হয়েছে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদকে ঘিরে সারা দেশে তৈরি হয়েছে আনন্দ, সম্প্রীতি এবং নিরাপত্তার এক সমন্বিত পরিবেশ। দীর্ঘ এক মাসের সংযমের পর এই উৎসব শুধু আনন্দের নয়, বরং মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বন্ধন আরও দৃঢ় করার এক অনন্য উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।

