ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে কেন্দ্র করে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভেতরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দলটিতে জমা পড়েছে ৫০০-এর বেশি আবেদন, যা দলীয়ভাবে একটি রেকর্ড হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা থেকেই আগ্রহী নারী নেত্রীরা এই সংরক্ষিত আসনের জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই আবেদনের জন্য নির্ধারিত কোনো ফরম ছিল না। ফলে আবেদনকারীরা সাদা কাগজেই নিজেদের জীবনবৃত্তান্ত লিখে জমা দিয়েছেন। এর সঙ্গে তারা যুক্ত করেছেন দলের জন্য নিজেদের কাজের বিবরণ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ইতিহাস এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার প্রমাণ।
অনেক আবেদনকারীর জীবনবৃত্তান্তের সঙ্গে ছিল মিছিল, মিটিং ও দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অসংখ্য ছবি। এসব আবেদন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উদ্দেশে জমা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির পল্টন কার্যালয়ের একাধিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
দলীয় কর্মকর্তারা জানান, ১৬ মার্চ পর্যন্ত এসব আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এত বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়া দলের ভেতরে নতুন উদ্দীপনারই ইঙ্গিত দেয়। এখন এসব আবেদন দলীয় হাইকমান্ডের কাছে পাঠানো হবে এবং সেখান থেকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
খুলনা থেকে আবেদন করা এক নারী নেত্রী জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাই সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হওয়ার প্রত্যাশায় আবেদন করেছেন।
তার ভাষায়,
“আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমার জীবনবৃত্তান্ত মূল্যায়ন করবেন।”
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে তিনি দলের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তাদের কাছ থেকে আশ্বাসও পেয়েছেন। শুধু তিনি নন—এমন আরও অনেক আবেদনকারীই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে তিনি দাবি করেন।
শুধু সরাসরি যোগাযোগ নয়, সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ সক্রিয়। অনেকেই একাধিক ফেসবুক পেইজ খুলে নিজেদের প্রচারণা চালাচ্ছেন।
এই পেইজগুলোতে দেখা যাচ্ছে—মিছিল, মিটিং এবং দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ছবি নিয়মিত পোস্ট করা হচ্ছে। এমনকি ‘পেইড সিস্টেমে’ এসব পোস্টে ইতিবাচক মন্তব্য ও সমর্থনও বাড়ানো হচ্ছে, যাতে দলীয় হাইকমান্ডের নজরে আসা যায়।
একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী জানিয়েছেন, মূল লক্ষ্য হলো—দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং নিজেদের সক্রিয়তা তুলে ধরা।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে তৎপরতা বেড়েছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বিভিন্নভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
বিশেষ করে মহিলা দল এবং সাবেক ছাত্রদলের নেত্রীরা এই দৌড়ে এগিয়ে আছেন বলে জানা গেছে। কে কোন আসনে মনোনয়ন পাবেন—এ নিয়ে দলের ভেতরে এখন জোর আলোচনা চলছে।
তবে শেষ পর্যন্ত সব সিদ্ধান্তই আসবে দলীয় হাইকমান্ড থেকে। ফলে এখন সবার দৃষ্টি সেই চূড়ান্ত ঘোষণার দিকে।
এদিকে বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র জানাচ্ছে, এখনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত হতে ঈদের পর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে। সাধারণ নির্বাচনে যে দল যতটি আসনে জয়ী হয়, সেই অনুপাতে এসব আসন বণ্টন করা হয়।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে। ফলে সংরক্ষিত ৫০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসন পাবে দলটি।
অন্যদিকে:
- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাবে ১১টি আসন
- জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ১টি আসন
- বাকি ৩টি আসন যাবে স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলোর মধ্যে
এই ছোট দলগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ ও খেলাফত মজলিস।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ২৯৯টি আসনে নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৬ জন। তাদের মধ্যে জয়ী হয়েছেন মাত্র ৭ জন—যার মধ্যে ৬ জন বিএনপির এবং ১ জন স্বতন্ত্র।
সংরক্ষিত ৫০টি আসন যুক্ত হলে সংসদে মোট নারী সদস্য দাঁড়াবে ৫৭ জনে, যা ৩৫০ সদস্যের সংসদের প্রায় ১৬ শতাংশ।
সব মিলিয়ে, সংরক্ষিত নারী আসনকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভেতরে যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা একদিকে যেমন নারী নেতৃত্বের উত্থানের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে তীব্র প্রতিযোগিতারও চিত্র তুলে ধরে।
মাত্র ৩৫টি আসনের জন্য ৫০০-এর বেশি আবেদন—এটাই প্রমাণ করে, সামনে কঠিন বাছাই প্রক্রিয়া অপেক্ষা করছে। এখন দেখার বিষয়, দলীয় হাইকমান্ড শেষ পর্যন্ত কাদের হাতে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দেয়।

