দেশের কৃষকদের জন্য বড় ধরনের একটি উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। কৃষি খাতে ভর্তুকি, ঋণ, প্রণোদনা ও বিভিন্ন সহায়তা সহজভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে চালু করা হচ্ছে ‘কৃষক কার্ড’। আগামী চার বছরে দেশের ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকরাই নয়, মৎস্যচাষি ও দুগ্ধখামারিরাও এই ব্যবস্থার আওতায় আসবেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে থাকা কাঠামোগত সমস্যাগুলো কমিয়ে কৃষকদের একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার মধ্যে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই কার্ডের মাধ্যমে একজন কৃষক প্রাথমিকভাবে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ পাওয়া, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা গ্রহণ, সেচ সুবিধা কম খরচে পাওয়া, সহজ শর্তে কৃষিঋণ গ্রহণ, কৃষি বীমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য এবং রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ। জমির পরিমাণ অনুযায়ী সার কেনার সুযোগ থাকায় অতিরিক্ত সারের ব্যবহার কমবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতিটি কৃষকের জন্য সোনালী ব্যাংকে আলাদা হিসাব খোলা হবে। কার্ডে একজন কৃষকের প্রায় ৪৫ ধরনের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সহায়তা সঠিকভাবে ও স্বচ্ছভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়। প্রথম ধাপে ২১ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের জমির পরিমাণ ও আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করার কাজও চলছে।
সরকার ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। এপ্রিলের মধ্যে এই কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর আরও বিস্তৃত পরিসরে এই কার্যক্রম চালিয়ে ধাপে ধাপে পুরো দেশে কৃষক কার্ড চালু করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পয়লা বৈশাখ, অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে চার বছরে ৬৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব ধরা হয়েছে। তবে প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যয় কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। সরকার আশা করছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন আসবে, কৃষকের আয় বাড়বে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাও উন্নত হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত কৃষকদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা। অনেক সময় অ-কৃষক বা মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি ভর্তুকি ও কৃষি উপকরণ বিতরণে অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট বা তদারকির অভাব থাকলে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও তথ্য ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে গড়ে তুলতে না পারলে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, কৃষক কার্ড চালুর এই উদ্যোগ কৃষি খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর তদারকির ওপর।

