রাহাদ সুমন, বরিশাল প্রতিবেদক—
“স্বাধীনতা মানে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ নয়, রূপকথা কিংবা গল্পগাঁথাও নয়। স্বাধীনতা মানে শোষণ-নির্যাতন ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বিশ্বসভায় একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা।” সেই স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে অসংখ্য নাম-না-জানা মানুষ অকাতরে জীবন উৎসর্গ করেছেন।
সেই শহীদদের কাতারে শামিল হয়েছিলেন বরিশালের বানারীপাড়ার দুই কৃতি সন্তান—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমদ্দার। দেশমাতৃকার জন্য আত্মোৎসর্গকারী ’৭১-এর এই দুই বুদ্ধিজীবী ইতিহাসে অমর হয়ে আজও এলাকাবাসীর হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁদের নিয়ে গর্বিত বানারীপাড়াবাসী।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কালরাতে প্রতিদিনের মতো খাওয়া-দাওয়া শেষে রাত নয়টার দিকে ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার পরিবারের সদস্যরা রেডিও শুনছিলেন। ঢাকা বেতার থেকে সেদিন কোনো বিপদের পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি। পরে ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ শুনে তিনি তাঁর মেয়ে মেঘনার কক্ষে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ প্রিলিমিনারি ও অনার্স পরীক্ষার খাতা দেখতে বসেন।
হঠাৎ বাইরে গোলাগুলির শব্দ শুনে তিনি ও তাঁর স্ত্রী বাসন্তী রানী গুহ ঠাকুরতা বাইরে তাকিয়ে দেখেন, মানুষজন রাস্তায় বড় বড় গাছ, পানির ট্যাংক ও ইটপাটকেল দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। পরিস্থিতি বুঝে তারা বাসার প্রবেশপথ তালাবদ্ধ করেন। তিনি ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “বিপদ আরম্ভ হয়ে গেল”, এরপর আবার খাতা দেখতে বসেন।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইকবাল হল ও রোকেয়া হলের দিক থেকে বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। চারদিকে গুলিবর্ষণ ও আলোর ঝলকানি। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে তিনি ও তাঁর স্ত্রী খাটের নিচে আশ্রয় নেন।
এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা বাসায় ঢুকে পড়ে। এক পাঞ্জাবি মেজর তাঁকে জিজ্ঞাসা করে, “আপ প্রফেসর সাহাব হ্যায়?” তিনি উত্তর দেন, “ইয়েস।” এরপর তাঁকে টেনে বাইরে নিয়ে গিয়ে নাম ও ধর্ম জিজ্ঞাসা করে। তিনি নিজের নাম ও ধর্ম বলার পরপরই তাঁকে গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে আবার বাসায় আনা হয়।
২৬ ও ২৭ মার্চ পর্যন্ত চিকিৎসার অভাবে তিনি বাসায়ই পড়ে ছিলেন। কারফিউ উঠে গেলে ২৭ মার্চ তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় ৩০ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মরদেহ পরিবারকে দেওয়া হয়নি। কয়েক দিন হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে থাকার পর তাঁর দেহের সৎকার করা সম্ভব হয়নি।
ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার জন্ম তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলায়। তাঁর পৈতৃক নিবাস বরিশালের বানারীপাড়ায়। তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, আনন্দমোহন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি প্রগতিশীল চিন্তার একজন অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী ছিলেন।
অন্যদিকে, সুখরঞ্জন সমদ্দার ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষক। মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অবাঙালি শিক্ষকের ইঙ্গিতে তাঁকে আটক করা হয়। সেদিনই তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিনোদপুর এলাকায় ফেলে রাখা হয়।
এর আগে তিনি এক আহত বাঙালি ইপিআর সদস্যকে আশ্রয় ও সেবা দিয়েছিলেন, যা তাঁর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে তাঁর মরদেহ স্থানীয় এক ব্যক্তি উদ্ধার করে গোপনে দাফন করেন। স্বাধীনতার পর তাঁর দেহাবশেষ উদ্ধার করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পুনঃসমাহিত করা হয়।
সুখরঞ্জন সমদ্দারের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার গ্রামে। তিনি বরিশাল বিএম কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।
বানারীপাড়াবাসীর দাবি, এই দুই শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁদের ভাস্কর্য নির্মাণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের জীবন ও আত্মত্যাগ তুলে ধরতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।

