আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৫৫তম বার্ষিকী আজ। এই দিনেই বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ—একটি রাষ্ট্র, যার জন্ম হয়েছে রক্ত, ত্যাগ আর অদম্য সাহসের ইতিহাস বুকে নিয়ে।
স্বাধীনতার এই গৌরবময় দিনটি এলেও এর পেছনে রয়েছে বেদনাবিধুর এক অধ্যায়। ১৯৭১ সালের মার্চজুড়ে চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের সেই আন্দোলনকে দমন করতে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর চালায় নির্মম হামলা। সেই কালরাতে শুরু হয় গণহত্যা, যা বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামকে আরও তীব্র করে তোলে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা আসে। শুরু হয় মুক্তির লড়াই—মহান মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ সহজ ছিল না। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হতে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সবক্ষেত্রেই চলতে থাকে শোষণ।
এর প্রথম বড় প্রতিরোধ দেখা যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রাণ দেন বহু বীর সন্তান। সেই আত্মত্যাগ বাঙালির মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করে।
এরপর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেও বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। বরং নানা কৌশলে তা বিলম্বিত করা হয়। এর প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের মার্চে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নেয়।
আজকের এই দিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের। তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা, যা আজও আমাদের প্রেরণার উৎস।
প্রতিবছরের মতো এবারও সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ সেখানে উপস্থিত থাকবেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিদেশি কূটনীতিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজ সারা দেশে সরকারি ছুটি। দিনটির গুরুত্ব তুলে ধরতে জাতীয় পত্রিকাগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ। টেলিভিশন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা অনুষ্ঠান।
দেশের বিভিন্ন মহানগর, জেলা ও উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার।
এবারের স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হচ্ছে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ভূমিকা জাতিকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। সেই চেতনা ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছে দেশ।
স্বাধীনতা শুধু একটি অর্জন নয়, এটি একটি চলমান দায়িত্ব। ৫৫ বছর পরও সেই চেতনা আমাদের পথ দেখায়—ন্যায়, সাম্য ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
আজকের দিনটি তাই শুধু উদযাপনের নয়, বরং প্রতিজ্ঞার—যে স্বাধীনতার মর্যাদা আমরা অটুট রাখব, আর শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলব।

