রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নদীতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের জন্ম হয়েছে। পদ্মার পাড়জুড়ে ভেসে আসছে স্বজন হারানোর শোক, কান্না আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস। নিখোঁজদের খোঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন পরিবারের সদস্যরা—কারও চোখে অশ্রু, কারও চোখে শেষ আশার আলো।
বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে পন্টুনে ওঠার সময় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে ডুবে যায়। এতে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ জন যাত্রী এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত দুই নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও বৃষ্টির কারণে শুরুতে উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে বর্তমানে পুরোদমে চলছে উদ্ধার অভিযান।
পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত যেন অনন্ত সময়ের মতো। কেউ খুঁজছেন সন্তান, কেউ স্ত্রী, কেউ আবার ভাই-বোনের খোঁজে ছুটে এসেছেন দূরদূরান্ত থেকে।
রোকন নামের এক ব্যক্তি জানান, তার বন্ধুর ছোট বোন ফাতেমা তুজ জোহরা ও তার স্বামী কাজী সাইফ আহমেদ ওই বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে আসেন, কিন্তু এখনো তাদের কোনো সন্ধান পাননি।
শরিফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন। তিনি জানান, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ভাগ্নি সাঁতরে প্রাণে বাঁচতে পারলেও তার সাত বছরের ছেলে ও এগারো বছরের ভাগ্নে এখনো নিখোঁজ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আমার টাকার দরকার নেই… আমার সন্তানের লাশটা শুধু আমাকে বুঝিয়ে দিক। আমার আর কিছু লাগবে না… আমার সব শেষ।”
তার এই আর্তনাদে আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে, চোখ ভিজে যায় উপস্থিত সবার।
নবীজ উদ্দিন নামের আরেকজন বৃদ্ধ তার নাতি-নাতনির খোঁজে বসে আছেন নদীর পাড়ে। চোখে অশ্রু, কণ্ঠে আকুতি—
“আল্লাহ, আমার দুইটারে ফিরিয়ে দাও…”
এই ধরনের অসংখ্য প্রার্থনা আর কান্নায় ভরে উঠেছে পুরো এলাকা।
ঘটনাস্থলে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করতে উপস্থিত হয়েছেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। তার সঙ্গে রয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
উদ্ধারকারী দল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তবে সময় যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে স্বজনদের উৎকণ্ঠা।
পদ্মার পাড়ে এখন শুধুই অপেক্ষা—কেউ বাঁচার, কেউ খোঁজ পাওয়ার, আর কেউ শেষবারের মতো প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার।
এই দুর্ঘটনা শুধু একটি খবর নয়, এটি অসংখ্য পরিবারের জন্য এক গভীর শোকের গল্প—যেখানে প্রতিটি কান্না মনে করিয়ে দেয়, জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই।

