জাতীয় সনদ অনুযায়ী জুলাই ২০২৫ সালে সংবিধান সংস্কারের জন্য কার্যকর করা ‘গণভোট অধ্যাদেশ’ নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে পৌঁছেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা অধ্যাদেশ বাতিল বা রাখার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। কিন্তু বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর দাবি, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি অধ্যাদেশটি বাতিলের চেষ্টা করছে।
গত বুধবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে এই দ্বিধাবিভক্তি পরিষ্কার হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি ১৩৩টি সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করছে। কমিটিতে ১১ জন সদস্য বিএনপি থেকে, তিনজন জামায়াতের। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি পাস করাতে দুই দল প্রাথমিকভাবে একমত হয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, গণভোট ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশেও বিএনপি পরিবর্তনের সুপারিশ করছে। বিরোধী পক্ষের অভিযোগ, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার প্রধানের একচ্ছত্র ক্ষমতা পুনরায় সংরক্ষণের চেষ্টা করছে, যা জুলাই সনদের নীতির পরিপন্থী।
বিশেষ কমিটি এখনও ২০টি অধ্যাদেশে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। কমিটির তৃতীয় বৈঠক আগামী ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। ইউনূস সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ ১৩ মার্চ সংসদে উত্থাপিত হয়েছে এবং আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে পাস হতে হবে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, আইন মন্ত্রণালয় থেকে গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশেও সংশোধনের সুপারিশ এসেছে।
জামায়াতের আরেক এমপি জিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বিএনপির আচরণ থেকে মনে হচ্ছে তারা গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “গণভোট হয়ে গেছে। এখন অধ্যাদেশ সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রস্তাব মানে অধ্যাদেশ বাতিল করার চেষ্টা।”
কমিটির সভাপতি ও বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন, তারা গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে কোনো স্থির অবস্থান নেননি। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও বলেছেন, বিষয়টি এখনও আলোচনার টেবিলে রয়েছে। তারা সংবিধানের আলোকে সব সিদ্ধান্ত নেবে।
বিএনপি দাবি করছে, বৈঠকে গণভোট বিষয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “একটা গ্লাসের অর্ধেক পানি কেউ অর্ধেক খালি মনে করতে পারে, আবার কেউ অর্ধেক ভরা।” অর্থাৎ, বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ১৩৩ অধ্যাদেশকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একভাগ যেমন ছিল, তেমনই পাস হবে, কিছুতে সংশোধনী আনা হবে এবং কিছু অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাবে। প্রয়োজনে পরবর্তী অধিবেশনে এগুলো বিল আকারে উত্থাপন করা হবে।
বিরোধী পক্ষের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন ও আইজিপি নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশে সরকারি দল আবারও প্রধানমন্ত্রীর হাতে নিয়োগ ক্ষমতা পুনঃসংরক্ষণের চেষ্টা করছে। জামায়াতের দাবি, এসব প্রস্তাব জুলাই চেতনার পরিপন্থি।
আইনমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, সরকার এখনও জুলাই সনদের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেছেন, সংবিধান ও জুলাই সনদকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই বিশেষ কমিটি এবং সংসদে আলোচনা চলবে। ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে কমিটির পরবর্তী বৈঠক, যেখানে শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এদিকে, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, গণভোট অধ্যাদেশ শুধু এক আইন নয়, বরং জাতীয় সংবিধান সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ভবিষ্যতের সংবিধান সংশোধন ও সরকারের ক্ষমতা বিন্যাসে প্রভাব ফেলবে

