বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের নেতৃত্বে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদ দাবি করে চলা আন্দোলন নগর ভবনের কার্যক্রমকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। গত ১৪ মে থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের ফলে সোয়া কোটিরও বেশি নাগরিক নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নগর ভবনে আন্দোলনকারী কর্মচারী ও ইশরাক সমর্থকদের অবরোধের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্তব্ধ এবং জনজীবনে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই সংকট সমাধানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।
আন্দোলনের পটভূমি ও শপথ নিয়ে জটিলতা:
ইশরাক হোসেন নিজেকে ‘জনগণের মেয়র’ ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন শুরু করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে বিগত সরকারের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস বিজয়ী হয়েছেন। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল বাতিল করে ইশরাককে বৈধ মেয়র ঘোষণা করে। ২৭ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলেও ইশরাকের শপথ গ্রহণ এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার হস্তক্ষেপ ও ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ এই শপথ বিলম্বিত করেছে। আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বলেন, “গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে শপথ পড়ানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা হয়নি।” আন্দোলনকারীরা এই ইস্যুতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে কঠোর কর্মসূচির হুমকি দিয়েছেন এবং সেই সময় থেকে এখনও আন্দোলন করে যাচ্ছে।
নাগরিক সেবায় হযবরল অবস্থা:
নগর ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নগর ভবনে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এখনও নাগরিকরা কোনো সেবা পাচ্ছেন না। বন্ধ রয়েছে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, হোল্ডিং ট্যাক্স গ্রহণ, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা, হিসাব বিভাগ এবং রাজস্ব আদায় কার্যক্রম।
প্রতিদিন ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ নাগরিক ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ সেবাসহ ২৮ ধরনের সেবা নিতে ডিএসসিসির প্রধান ও আঞ্চলিক কার্যালয়ে আসেন কিন্তু গত ৩৫ দিন ধরে এই সেবাগুলো বন্ধ। হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়, নতুন ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, হাসপাতাল কার্যক্রম, নর্দমা-ফুটপাত মেরামত, বাজার, ব্যায়ামাগার, কমিউনিটি সেন্টার, মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র, গাড়ি পার্কিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার, পাবলিক টয়লেট, পার্ক, খেলার মাঠ, হোল্ডিং নম্বর ইস্যু, নামজারি, কবরস্থান ব্যবস্থাপনা এবং বহুতল ভবনের অনাপত্তিপত্র- সব ক্ষেত্রেই সেবা বিঘ্নিত।
- লালবাগের বাসিন্দা মাহবুব ইসরাইল তিন দিন ধরে তার নাতির জন্ম সনদ সংশোধনের জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।
- ধানমন্ডির গৃহিণী নাসরিন জাহান বলেন, “তিন দিন ঘুরছি একটা নাম সংশোধনের জন্য কিন্তু কেউ ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না।”
- পুরান ঢাকার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমার অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে জন্ম সনদ লাগবে। ২৫ দিন ধরে সনদ না পাওয়ায় পাসপোর্টের আবেদন করতে পারছি না। আমার মেয়ের অবস্থা খারাপ হচ্ছে।”
- ব্যবসায়ীরা ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন না করতে পারায় সমস্যায় পড়ছেন।
- নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক জন বলেন, আন্দোলনের কারণে যানজট লেগেই থাকে, মানুষের গন্তব্যে পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। তাই মানুষ প্রয়োজনে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে; এভাবে আর কতদিন!
জনমত ও নাগরিক প্রতিক্রিয়া:
- রাজধানীবাসীর মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকরা বলছেন, “সরকার ও আন্দোলনকারীরা একে অপরকে দোষারোপ না করে দ্রুত সমাধানে যাক। জনগণের ভোগান্তি আর নিতে পারছি না।”
- সিদ্দিকবাজারের তাহেরা খাতুন বলেন, “এক মাস ধরে ওয়ারিশ সনদের জন্য ঘুরছি। নগর ভবন বন্ধ থাকায় আমাদের পরিবারে অশান্তি চলছে।”
- ডিএসসিসির প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, “দাপ্তরিক কাজ করা যাচ্ছে না। ময়লা পরিষ্কার, মশার ওষুধ বিতরণ, সড়কবাতি লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। হাজারো মানুষের প্রশ্নের জবাব দিতে পারছি না।”
এমন অনেক সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পাচ্ছে না নগরবাসী। ভোগান্তিতে পড়েছে দক্ষিণ সিটির সোয়া কোটি নাগরিক।
প্রশাসনিক ও আর্থিক সংকট:
রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, “করদাতারা সরাসরি নগর ভবনে কর পরিশোধ করেন। এখন কেউ আসতে পারছেন না, ফলে রাজস্ব আদায় বন্ধ।” এই আর্থিক সংকটের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রদানে সমস্যা হতে পারে। হিসাব বিভাগ বন্ধ থাকায় বাজেট ব্যবস্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নগর ভবনে ঢুকতে না পেরে গ্রামে চলে গেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রকল্প থেমে আছে। জরুরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সীমিত আকারে চললেও পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও বেসরকারি অংশীদারদের মাধ্যমে তা রক্ষা করা হচ্ছে। প্রকৌশলীরা জানান, চলমান রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কাজ তদারকি করা যাচ্ছে না।
ইশরাকের কার্যক্রম বিপরীতে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সমালোচনা:
ইশরাক গত সোমবার নগর ভবনের মিলনায়তনে কর্মচারীদের নিয়ে বৈঠক করেন, যেখানে ব্যানারে তাকে ‘মাননীয় মেয়র, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বুধবার আরেকটি বৈঠকে ব্যানারে লেখা হয় ‘নির্বাচিত মেয়র’। বৈঠক শেষে তিনি সমর্থকদের নিয়ে মশক নিধন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন এবং নিজে ফগার মেশিন হাতে নিয়ে অংশ নেন। তিনি বলেন, “সরকার নগরবাসীর সেবায় বাধা সৃষ্টি করছে। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া কর্মকর্তাদের কাজ করতে নিষেধ করেছেন। এমন শিশু উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলা আমাদের জন্য অবমাননাকর। বর্তমান সরকার সবকিছুর জন্য দায়ী।”
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, “ইশরাক নগর ভবনের মিলনায়তন ও অফিস দখল করে নাগরিক সেবায় বাধা দিচ্ছেন। এটা ফৌজদারি অপরাধ।” ইশরাক পাল্টা বলেন, “আমাকে শপথ না পড়িয়ে সরকার আইন ভঙ্গ করছে। ফৌজদারি অপরাধ করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে গ্রেপ্তার করা উচিত। সরকার তা করছে না কেন?” সজীব জবাবে বলেন, “নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।” দুজনেই ফেসবুকে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন।
বিএনপির ভাষ্য:
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, দল ইশরাকের আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেবে না এবং সরাসরি সম্পৃক্ত হবে না। তবে চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে কিছু কর্মচারী ইশরাকের বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।
আইনি প্রশ্ন:
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ বলেন, “ইশরাক আইনিভাবে মেয়র হতে পারেননি। আদালতের রায়ের সময়সীমা শেষ হয়েছে এবং পরিষদের মেয়াদও ২ জুন শেষ হয়েছে। শপথ না নিয়ে মেয়রের দায়িত্ব পালনের কোনো সুযোগ নেই। ‘মাননীয় মেয়র’ বা ‘নির্বাচিত মেয়র’ পদবি ব্যবহার অবৈধ। যে কর্মচারীরা তার বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন, তারাও আইন লঙ্ঘন করছেন।”
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “যে নির্বাচন অবৈধ ছিল, সেখানে ইশরাক মেয়র হওয়ার দাবি করছেন। সরকার পর্ষদ বাতিল করেছে এবং আদালতের রায়ের মেয়াদ শেষ। তার মেয়র হওয়ার সুযোগ নেই।”
পরিশেষে, ইশরাক হোসেনের ‘মেয়র আন্দোলন’ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম স্তব্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে সোয়া কোটি নাগরিক চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। নগর ভবনের অচলাবস্থা শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়, পুরো ঢাকার জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে। আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে সরকার ও আন্দোলনকারীদের আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো জরুরি, যাতে নাগরিক জীবন স্বাভাবিক হয়। অন্যথায়, প্রশাসনিক ও আর্থিক ধসের পাশাপাশি জনগণের দুর্ভোগ আরো বাড়বে।

