সরকার বদলেছে, কিন্তু জেলখানার ভেতরের চিত্র বদলায়নি—বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে একের পর এক গ্রেপ্তারের ঘটনায় দেশের কারাগারগুলো যেন বন্দী সংকটের এক বেদনাদায়ক উপাখ্যান হয়ে উঠেছে।
প্রতিদিনই চলছে গ্রেপ্তার অভিযান। খুন, গুম, সহিংসতা, দুর্নীতি—বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেফতার হচ্ছেন সাবেক মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে আমলা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ, এমনকি সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীরাও।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ‘বিশেষ অভিযান’ চালিয়ে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এসব গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ঠাঁই দেওয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন কারাগারে। ফলে কারাগারগুলোতে এখন উপচে পড়া ভিড়—অনেক জায়গায় ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দী রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ৭০টি কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ১৫৭ জন। অথচ চলতি বছরের ১ জুলাই পর্যন্ত ৭২ হাজার ১০৫ জন বন্দী ছিল এইসব কারাগারে। শুধু কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই ৪ হাজার ৫৯০ জন ধারণক্ষমতার জায়গায় এখন গাদাগাদি করে থাকছেন প্রায় ৮ হাজার বন্দী।
আর এই সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিনই।
সরকার পতনের পর নানা অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় শুধু রাজনীতিবিদ নয়—আছেন সাবেক সচিব, বিচারপতি, সেনা ও নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, পুলিশ বাহিনীর উচ্চপদস্থ সদস্য, শিল্পপতি, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তারকা এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী।
তবে শুধু রাজনৈতিক মামলাই নয়, ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, এমনকি যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত কিংবা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরাও রয়েছে এই তালিকায়।
কারা অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্দীদের মধ্যে পুরুষ ৬৯ হাজার ৪৩৮ জন এবং নারী ২ হাজার ৬৬৭ জন। সাজাপ্রাপ্ত রয়েছেন ১৮ হাজার ৪২৬ জন, আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীর সংখ্যা ২ হাজার ৬০২ জন।
ঢাকা বিভাগের ১৮টি কারাগারে ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৫৮২ জন, অথচ বর্তমানে বন্দী ২৫ হাজার ৫৯৮ জন।
-
কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে: ধারণক্ষমতা ৪,৫৯০ → বন্দী ৭,৯৮৭ জন
-
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২: ধারণক্ষমতা ২,০০০ → বন্দী ৩,৩৬৩ জন
-
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার: ধারণক্ষমতা ১,০০০ → বন্দী ২,৫৩২ জন
-
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার: ধারণক্ষমতা ৫৪০ → বন্দী ১,৩৩৫ জন
-
মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার: ধারণক্ষমতা ২০০ → বন্দী ৫৪৫ জন
চট্টগ্রাম বিভাগের চিত্র আরও ভয়াবহ। ১১টি কারাগারে যেখানে ধারণক্ষমতা ৬ হাজার ৯৫০, সেখানে বন্দী ১৪ হাজার ৬৭২ জন।
-
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে: ধারণক্ষমতা ১,৮৫৩ → বন্দী ৫,১৪৭ জন
-
কক্সবাজার জেলা কারাগারে: ধারণক্ষমতা ৮৩০ → বন্দী ২,৪৩৬ জন
রাজশাহীতে ৪ হাজার ১৭৯ ধারণক্ষমতায় বন্দী রাখা হচ্ছে ৯ হাজার ২৭ জন। বগুড়ায় ৭২৩ জনের জায়গায় আছেন ১ হাজার ৭৩০ জন।
বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, সিলেট, রংপুর—প্রায় প্রতিটি বিভাগেই অধিকাংশ কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ বন্দী রাখা হচ্ছে।
গাদাগাদি করে থাকায় বাড়ছে রোগবালাই। কারাগারের চিকিৎসা কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা যায় ত্বকের রোগে। স্ক্যাবিস, চর্মরোগ, হাড়ক্ষয়, এমনকি হার্টের জটিলতা—সবকিছুই বাড়ছে বন্দীদের মধ্যে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সহকারী সার্জন ডা. মেহেদী হাসান বলেন,
“বন্দীদের বিশ্রাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসা—সবই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে। দীর্ঘদিন এভাবে থাকলে রোগ বাড়বে, মনোবল ভাঙবে।”
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন,
“বিচারিক আদেশে যেসব গ্রেপ্তার হচ্ছেন, তাঁদের আমরা কারাগারে নিচ্ছি। অনেক কারাগারে ধারণক্ষমতার বাইরে বন্দী রয়েছে, তবে সব জায়গায় না। কোথাও কমও রয়েছে।”
তবে বাস্তবতা হলো—সর্বত্রই চাপ বাড়ছে, এবং দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।একটা রাষ্ট্রের সভ্যতা যাচাই হয় তার কারাগারের অবস্থার মধ্য দিয়ে। যদি অপরাধীও মানুষ হয়, তাহলে তার প্রাপ্য ন্যূনতম সম্মান, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আবাস—এটুকু অধিকার নিশ্চয়ই তারা পাওয়ার কথা।
এই সংকটের সমাধান শুধু আটক কমিয়ে নয়, বরং সুষ্ঠু বিচার, বিকল্প সাজা, এবং আধুনিক কারা সংস্কার—সবই এখন জরুরি।

