সংসদীয় ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে হ্রাস পাবে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে। সর্বোচ্চ ১০ বছর একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন গঠন, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ এবং কিছু সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে দেওয়ার প্রস্তাব এতে অন্তর্ভুক্ত।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কার্যকর ভারসাম্যের অভাব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য হুমকি। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাংবিধানিক সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হলো একাধিকার শাসন রোধ, রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে যথাযথ ক্ষমতায়ন। এজন্য কমিশন প্রস্তাব করেছিল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিবর্তন, রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা প্রদানের বিধান, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং একই ব্যক্তিকে দীর্ঘ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার নিয়ম।
তবে কিছু প্রস্তাবে বিএনপি ও অন্যান্য দলের ভিন্নমত থাকায় কিছু সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কৌশল এখনও নির্ধারিত হয়নি। এতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সামান্যই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া-
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকে। কমিশন প্রস্তাব করেছিল জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন, যা নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেল ও তিন বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ করবে। পরে ইসি, পিএসসি, ন্যায়পাল, মহাহিসাব নিরীক্ষক, নিয়ন্ত্রক (সিএজি) ও দুদক গঠনের জন্য আলাদা বিধান প্রস্তাব করা হয়। এটি কার্যকর হলে প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ ক্ষমতা সীমিত হতো। তবে বিএনপি ও কিছু দল এটি বাতিলের পক্ষে ছিলেন।
এখন নির্বাচিত কমিটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ দেবেন। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল ও আইন কমিশনে সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির হাতে থাকবে।
একাধিক পদে থাকার বিধান-
সংসদীয় ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি একাধারে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলের প্রধান হয়ে আসেন। সংস্কার কমিশন প্রস্তাব করেছে, একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান বা সংসদ নেতা হতে পারবেন না। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য আসে, যদিও বিএনপি ও কিছু দল এ বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা-
যেমন, নির্বাচন কমিশন গঠন এবং গুরুত্বপূর্ণ চারটি সংসদীয় কমিটি ও অন্যান্য বিশেষ কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হওয়ার বিধান। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের’ পরিবর্তে ‘মন্ত্রিসভার অনুমোদনের’ বিধান যুক্ত হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি-
সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাষ্ট্রপতির জন্য ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল। এর মধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা, অ্যাটর্নি জেনারেল, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইউজিসি ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন অন্তর্ভুক্ত।
সংসদে জবাবদিহি ও ভারসাম্য-
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচন প্রস্তাব হয়েছে। অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। সরকারি হিসাব, অনুমিত হিসাব, বিশেষ অধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আশা করছে, এই কমিটিগুলো প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহিতায় আনতে ভূমিকা রাখবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, যেভাবে ঐকমত্য হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারিত হয়েছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত।

