জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোটে চারটির বেশি প্রশ্ন রাখা হতে পারে, এমন ভাবনা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে প্রধান ধারণা হলো: যেসব বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতসহ অধিকাংশ দল একমত, সেগুলো নিয়ে একটি প্রশ্ন থাকবে।
অন্যদিকে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং অন্যান্য মৌলিক প্রস্তাবে বড় দল বিশেষ করে বিএনপির ভিন্নমত থাকলে আলাদা কয়েকটি প্রশ্ন রাখা হবে। সরকারের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সব মিলিয়ে গণভোটে চার-পাঁচটি প্রশ্ন রাখা হতে পারে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সরকার আশা করছে, এভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হলে দলগুলো বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তা মেনে নেবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল মঙ্গলবার জানিয়েছেন, সনদ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে পরিষ্কারভাবে জানা যাবে।
সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব খসড়া আদেশের তফসিলে রাখা হয়েছে। ঐকমত্য কমিশন একটি আদেশ জারি করে গণভোট করার সুপারিশ করেছিল, যেখানে শুধুমাত্র একটি প্রশ্ন রাখার পরামর্শ ছিল। কিন্তু ৩০টি দলের সঙ্গে আলোচনার পর তৈরি জুলাই জাতীয় সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। এই ৪৮টির মধ্যে অন্তত ৩০টি প্রস্তাবে কোনো না কোনো দলের ভিন্নমত আছে।
বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, গণভোটে অন্তর্ভুক্ত প্রশ্নগুলো হতে পারে:
- বৃহত্তর একমত প্রস্তাব: ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে একটি প্যাকেজ প্রশ্ন রাখা হতে পারে। ভোটারদের কাছে জিজ্ঞেস করা হবে, এই ৩০টি প্রস্তাবের বাস্তবায়ন চান কি না।
- পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন: সংসদের উচ্চকক্ষ পিআর পদ্ধতিতে গঠনের বিষয়টি আলাদা প্রশ্ন হিসেবে রাখা হতে পারে।
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রস্তাব অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাস্তবায়ন চান কি না, এমন প্রশ্ন রাখা হতে পারে।
- ন্যায়পাল ও নিয়োগ প্রক্রিয়া: ন্যায়পাল, সরকারি কর্মকমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগ সংক্রান্ত সংবিধান অন্তর্ভুক্ত করতে চান কি না, এ বিষয়ে একটি পৃথক প্রশ্ন হতে পারে।
প্রক্রিয়া ও সময়সীমা:
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি হবে। এরপর ওই আদেশ ও ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোট হবে। হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। বিকল্প সুপারিশে বলা হয়েছে, যদি সংসদ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যর্থ হয়, প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে।
আইন উপদেষ্টার মন্তব্য:
আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ নির্দেশনা দেবে। আমরা প্রত্যাশা করেই বসে থাকিনি; নিজেদের মতো কাজ করেছি। সনদ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে পরিষ্কার হবে।’ তিনি আরও বলেন, সব দলের প্রত্যাশা সমন্বয় করে দেশের এবং জনগণের স্বার্থে যা প্রয়োজন, সেটাই করা হবে।
পূর্বে মতবিনিময় সভায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ঐকমত্য কমিশন প্রচুর আলোচনা করেছে, কিন্তু সংস্কার হয়নি এবং কিছু অপপ্রচারও চলছে। তিনি পুলিশের সংস্কার কমিশন আইনের খসড়া তৈরির উদাহরণ দিয়ে বলেন, আইনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করতে চেয়েছিল, কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় পরে উদ্যোগ নিয়ে প্রস্তুত করেছে।
আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল যে, কমিশন তিনজন আইজিপির নাম প্রস্তাব করবে এবং সরকার সেই তিনজনের মধ্যে একজনকে আইজিপি পদে নিয়োগ দেবে। কিন্তু আন্তমন্ত্রণালয় কমিটিতে পাঠালে আমলাতন্ত্র আইনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায়।

