পুরোনো আইন ও প্রচলিত দমন-পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি কতটা যৌক্তিক—এ বিষয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন। তিনি বলেন, যাঁরা ‘ইয়ার্কি’ নামের ব্যঙ্গ–বিদ্রূপভিত্তিক ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তাঁদের দাবি হলো তাঁরা নাকি নতুন গণতন্ত্র গঠনের কাজ করছেন। কিন্তু সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ কি এভাবেই তৈরি হবে—প্রশ্ন রাখেন তিনি।
তাঁর মতে, পুরোনো হাতিয়ার এবং পুরোনো আইন ব্যবহার করে নতুন গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরির প্রচেষ্টা বাস্তবে সাংঘর্ষিক।
শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘স্যাটায়ার, মিম ও কার্টুন: মতপ্রকাশ নাকি মর্যাদাহানি’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘নাগরিক কোয়ালিশন’ এবং ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘e-আরকি’ যৌথভাবে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সেখানে সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, আইনজীবী, স্যাটায়ারিস্ট, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন নাগরিক সমাজ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিগত সরকারের শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রসঙ্গ টেনে সারা হোসেন বলেন, তখন বলা হয়েছিল কেউ সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধনের চেষ্টা করলেও সেটিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে গণ্য করা হবে এবং এর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় শুধু মতপ্রকাশের কারণে বা কথার জন্য শাস্তি পাওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা এখন সবাই করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মিম, স্যাটায়ার ও কার্টুনের রাজনৈতিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, এগুলো তামাশার ভাষায় ক্ষমতাশালীদের প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে। তাই সমাজে ও রাজনীতিতে এগুলোর একটি প্রয়োজনীয় জায়গা আছে। অথচ সেই জায়গাটাকেই মামলা দিয়ে সংকীর্ণ করে ফেলা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনলাইনে ‘অপপ্রচার’ এবং নারী নেত্রীদের সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগে কিছু ফেসবুক আইডি ও পেজের বিরুদ্ধে গত ২ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি আবু সাদিক কায়েম মামলা করেন। তিনি পরে জানান, মামলা করার আগে সাইবার সাপোর্ট ইউনিট, প্রধান উপদেষ্টার স্বরাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে। পরে তিনি অভিযোগগুলো লিখিতভাবে জমা দেন।
এই প্রক্রিয়া নিয়েই আজকের সভায় নতুন করে প্রশ্ন তোলেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, মামলা দায়েরের আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিএমপি, এমনকি গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) যাওয়া—এসব কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ? তাঁর মতে, এ ধরনের মামলা করতে যাঁরা প্রশ্রয় দিয়েছে তাঁদেরও প্রশ্নের আওতায় আনা প্রয়োজন।
গণতন্ত্রের চর্চাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, গণতন্ত্র কোনোভাবেই শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্র মানে বিভিন্নমত শোনা, তর্কবিতর্কের সুযোগ রাখা এবং সহনশীলতার অনুশীলন করা। এই ভিত্তিগুলো দুর্বল হলে গণতন্ত্রের ভিতও দুর্বল হবে।
সভায় ‘উন্মাদ’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব মামলার ঘটনার প্রতিবাদ জানান। আরো বক্তব্য দেন ইউল্যাবের শিক্ষক সুমন রহমান, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, লেখক ফিরোজ আহমেদ, কার্টুনিস্ট সিমু নাসের এবং কার্টুনিস্ট মেহেদী হকসহ অনেকে।

