বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতার সময়টা যেন আর কাটছেই না। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর কূটনৈতিক উত্তেজনার এই বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়াও আর আলাদা কোনো দ্বীপ হয়ে থাকতে পারেনি। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশ চেষ্টা করছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আবার দাঁড়াতে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এক-দেড় মাসের মধ্যেই একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে।
তবে নতুন বছর, নতুন সরকার এলেই যে রাতারাতি সব সংকট কেটে যাবে—এমন ভাবার সুযোগ নেই। দেশের ভেতরের নীতি ও সিদ্ধান্ত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাইরের বিশ্ব কীভাবে এগোচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলো কোন পথে হাঁটছে—সেসবের প্রভাবও বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হবে। তাই আগামী সময়টায় পররাষ্ট্রনীতিতে চ্যালেঞ্জ কম নয়।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে—নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে, যা দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, বিশ্বের অনেক দেশই এখন অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। তাঁর মতে, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হলে নতুন সরকারের কাজ কিছুটা সহজ হবে। তবে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ইস্যুগুলো খুব দ্রুত সামনে এসে বড় চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে। তিনি মনে করেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজাতে হবে, সেখানে সময় ও কৌশলী মনোযোগ জরুরি।
পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের বিশ্লেষণ আরও সরাসরি। তাঁর মতে, ভারত ও মিয়ানমার—দুই দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের সীমান্ত আছে। অথচ এই দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, কৌশলগত বোঝাপড়া ও নাগরিক পর্যায়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের দূরত্ব রয়ে গেছে। এই দূরত্ব কমানো না গেলে ‘কার্যকর সম্পর্ক’ বজায় রাখা কঠিন হবে। আর এমন দুর্বল সম্পর্কের সুযোগ নেবে তৃতীয় পক্ষ।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। শেখ হাসিনার সরকারের সময় ভারত এই সম্পর্ককে ‘সোনালি অধ্যায়’ বলে প্রচার করলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ভারত যে সহজভাবে গ্রহণ করেনি, তা কূটনৈতিক আচরণেই স্পষ্ট। ৩১ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরও সেই ইঙ্গিতই দেয়। তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের কাছে ভারতের ‘বার্তা’ পৌঁছে দেন এবং নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি হস্তান্তর করেন, যেখানে দুই দেশের সম্পর্কের ‘নতুন সূচনার’ ইঙ্গিত ছিল।
ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে হাইকমিশনার তলবের ঘটনার পর এই সংক্ষিপ্ত সফর কূটনৈতিক মহলে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই বিবেচিত হয়েছে। এমনকি রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার কোজিনও প্রকাশ্যে দুই দেশের উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানান, যা কূটনৈতিক ভাষায় একটি স্পষ্ট বার্তা।
ভারতীয় বিশ্লেষক ব্রহ্ম চ্যালানি মনে করেন, বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের সরাসরি যোগাযোগের অর্থ হলো—বাংলাদেশে ভবিষ্যতে উগ্রবাদী প্রবণতা ঠেকাতে দিল্লি সব রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তবে অন্য বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তের দুই পাশে উগ্রবাদী তৎপরতা থাকায় এই নতুন সেতু কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের চাপ নতুন নয়। ঢাকার রাজনৈতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে এটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ হিসেবেই দেখে এসেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সাম্প্রতিক সময়ে এই ইস্যুতে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে, যা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তব দিকগুলো—সীমান্ত হত্যা, নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্য—এখনও অমীমাংসিত। ২০২৬ সালে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, অথচ এই বিষয়ে কোনো পক্ষই স্পষ্ট অবস্থান জানাচ্ছে না। সীমান্ত হত্যাও থামেনি। ২০২৫ সালেই প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে নিহত হয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানও সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশটি একের পর এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে ঢাকায়। বাণিজ্য বাড়ানো, আকাশ ও সাগরপথে যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং এমনকি চীনকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় জোটের ভাবনাও সামনে এসেছে। যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক’ করার চেষ্টাই চলছে।
এই পুরো সমীকরণে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র—সবাই নজর রাখছে বাংলাদেশ কোন পথে এগোয়। নতুন সরকারপ্রধান প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে কোন দেশটি বেছে নেন, সেটিও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বড় সংকেত হিসেবে বিবেচিত হবে।
এদিকে রোহিঙ্গা সংকট এখনো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বোঝা। ২০১৭ সাল থেকে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো যায়নি। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে, রাখাইনে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল। ফলে নতুন সরকারের সময়ও এই সংকট আরও জটিল হতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। রেমিট্যান্স আয়ের দেশগুলো এখন দক্ষ শ্রমিক চায়, অথচ বাংলাদেশ এখনো সংখ্যার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। দক্ষতা উন্নয়ন না হলে এই আয় ধরে রাখা কঠিন হবে। একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতায় শুল্ক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইনের শাসন, সুশাসন, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই। পররাষ্ট্র, বাণিজ্য ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব নিশ্চিত না করলে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের সামনে সময়টা সহজ নয়। তবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত, বাস্তবতা মেনে চলা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে পারলে এই কঠিন পথও অতিক্রম করা সম্ভব—এমনটাই মনে করেন কূটনৈতিক মহল।

