২০২৫ সালে একের পর এক নীতিগত উদ্যোগ, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং আশাবাদের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে তেমন কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। বছরের শেষ প্রান্তে এসে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মূল্যায়ন বলছে—দীর্ঘদিনের সংকটগুলো যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গেছে, কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত বিকল্প বা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই অপারেশনাল প্ল্যানভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা স্থগিত করায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে সেবাব্যবস্থা কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, সরকারের ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ, কিছু চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের মতো উদ্যোগ থাকলেও রোগীদের নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা খরচ (আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার) কমেনি। বরং অনেকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এখনো নাগালের বাইরে।
তার ভাষায়, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। প্রস্তাবিত হেলথ কমিশন কিংবা কার্যকর রেফারাল ব্যবস্থা—কোনোটিই বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি।
একই সুর শোনা গেছে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মো. আকরাম হোসেনের কণ্ঠে। তিনি বলেন, পুরো বছরজুড়ে স্বাস্থ্যখাত প্রায় স্থবির ছিল। মানুষের মৌলিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে কোনো আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা আরও হতাশাজনক। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সেবা প্রদানের জায়গায় মানুষের অভিজ্ঞতায় তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। অনেক এলাকায় চিকিৎসক ও ওষুধের ঘাটতি অব্যাহত ছিল। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি ও সাপের কামড়ের অ্যান্টিভেনম সংকট বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।
অধ্যাপক হামিদের মতে, আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালে স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি। বরং বছরজুড়ে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী ও টেকনিশিয়ানদের আন্দোলনের কারণে সেবা কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হয়েছে।
সরকার অবশ্য ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৮৯টি সুপারনিউমারারি চিকিৎসক পদ সৃষ্টি করে এবং প্রায় ৩ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিয়োগ ও পদোন্নতির সুফল রোগীর পর্যায়ে খুব একটা পৌঁছায়নি। কারণ অবসর, পদত্যাগ ও বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে ইতোমধ্যেই হাজার হাজার পদ শূন্য হয়ে পড়েছিল।
২০২৪ সালের জুন মাসে সরকার চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির আওতায় থাকা অপারেশনাল প্ল্যানগুলো স্থগিত করে। এসব প্ল্যানের অধীনে রোগ নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, টিকাদান, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা পরিচালিত হতো। কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহে বারবার বিঘ্ন ঘটে, যা উচ্চ রক্তচাপসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলেছে।
কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ সাপোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান এ এম জাকির হোসেন ওষুধ সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, অর্থের সংকটে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা ও মেরামত কাজও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার মতে, ২০২৫ সালে বেশ কিছু নীতিগত নথি তৈরি হলেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ হয়নি।
তিনি বলেন, “অনেক আশা ছিল। মনে হয়েছিল এবার কিছু একটা বদলাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।”
উল্লেখ্য, স্বাস্থ্যখাতে গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে সরকার ২০২৪ সালে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন গঠন করে। কমিশন ২০২৫ সালের মে মাসে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে পৃথক স্বাস্থ্য কমিশন গঠন, বাজেট বাড়ানো, স্বাধীন স্বাস্থ্য ক্যাডার, জরুরি চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, কার্যকর রেফারাল ব্যবস্থা এবং বিকেন্দ্রীকৃত স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল।
অধ্যাপক আকরাম হোসেন বলেন, প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে কার্যত কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এমনকি সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের পথ নিয়ে কমিশনের সঙ্গে আলোচনাও করা হয়নি।
কমিশন দেশীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্পকে উৎসাহিত করে আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছিল, সেটিও এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
অন্যদিকে, জরুরি ওষুধের তালিকা হালনাগাদ ও মূল্য কাঠামো নির্ধারণে সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই ব্যবস্থাও কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়ে গেছে।
অধ্যাপক হামিদ জোর দিয়ে বলেন, মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারকে আরও শক্ত ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সালে না বিশেষায়িত চিকিৎসা, না সাধারণ স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা—বিশেষ করে রোগ নজরদারি ও মহামারি প্রস্তুতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো আগের মতোই অবহেলিত রয়ে গেছে।

