জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া প্রার্থীদের বড় অংশই উচ্চশিক্ষিত। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির প্রায় ৯৪ শতাংশ প্রার্থী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। বিএনপিতে এই হার প্রায় ৮১ শতাংশ। অন্যদিকে মোট প্রার্থীদের মধ্যে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোয়নি বা নিজেদের ‘স্বশিক্ষিত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এমন প্রার্থীও রয়েছেন ৮ শতাংশের বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষিত হলেই সংসদ সদস্যরা ভালো কাজ করবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাঁদের মতে, দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা, সততা এবং মানবিক মূল্যবোধই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, উচ্চশিক্ষিত হলেই সংসদ সদস্যরা ইতিবাচক পরিবর্তন আনবেন—এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। অতীতে যাঁরা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িয়েছেন, তাঁদের বড় অংশই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। তাঁর মতে, একাডেমিক সনদের চেয়ে ভালো মানুষ হওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সার্টিফিকেট দেখেই কারও যোগ্যতা নির্ধারণ করা ঠিক নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের জন্য মোট ৩ হাজার ৪০৬টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে জমা পড়ে ২ হাজার ৫৬৮টি। জমা দেওয়া মনোনয়নপত্রের মধ্যে ২ হাজার ৯০টি এসেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থেকে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেন ৪৭৮ জন। যাচাই-বাছাই শেষে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৮৪২টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রার্থী রয়েছেন ১ হাজার ৩৯৮ জন। এর মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারী ৫২২ জন, যা মোট প্রার্থীর ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী রয়েছেন ৮৭৬ জন, যা ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে মোট প্রার্থীর ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশকে উচ্চশিক্ষিত হিসেবে ধরা যায়।
অন্যদিকে উচ্চমাধ্যমিক পাস প্রার্থী রয়েছেন ১৭৪ জন, যা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। মাধ্যমিক পাস প্রার্থী ১১১ জন, যা ৬ দশমিক ১ শতাংশ। আর ১৫৯ জন প্রার্থী, অর্থাৎ ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, হলফনামায় নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিকের কম বা ‘স্বশিক্ষিত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দলভিত্তিক হিসাবে শিক্ষাগত যোগ্যতায় সবচেয়ে এগিয়ে জামায়াতে ইসলামী। দলটির ২০০ জন প্রার্থী স্নাতকোত্তর বা সমমান ডিগ্রিধারী এবং ৫৭ জন স্নাতক বা সমমান ডিগ্রিধারী। এতে করে দলটির মোট প্রার্থীর প্রায় ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। এ ছাড়া ৮ জন উচ্চমাধ্যমিক, ৬ জন মাধ্যমিক এবং ৩ জন নিজেদের স্বশিক্ষিত বলে উল্লেখ করেছেন।
বিএনপির ২৯১ জন প্রার্থীর মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ২৩৫ জন। যা মোট প্রার্থীর ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ১০৮ জন স্নাতক এবং ১২৭ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। দলটির ২২ জন উচ্চমাধ্যমিক, ১৮ জন মাধ্যমিক এবং ১৬ জন প্রার্থী মাধ্যমিকের কম শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা জানিয়েছেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত রয়েছেন ১৭১ জন। যা ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে ৪৯ জন স্নাতক এবং ১২২ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। দলটির ২৩ জন উচ্চমাধ্যমিক, ১২ জন মাধ্যমিক এবং ২০ জন স্বশিক্ষিত বলে উল্লেখ করেছেন।
জাতীয় পার্টির ১৪৭ জন প্রার্থীর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত রয়েছেন ৮২ জন। যা প্রায় ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে ৫১ জন স্নাতক এবং ৩১ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। দলটির ২৪ জন প্রার্থী নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিকের কম বলে জানিয়েছেন।
গণঅধিকার পরিষদের ৭৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪৬ জন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। অর্থাৎ দলটির প্রায় ৫৯ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত। জাতীয় নাগরিক পার্টির ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। তাঁদের মধ্যে ২৫ জন স্নাতকোত্তর এবং ১৩ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেও উচ্চশিক্ষিতদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ১১৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ৯২ জন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। যা মোট স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রায় ৭৮ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে ৪৮ জন স্নাতকোত্তর এবং ৪৪ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী।
সংবিধানে সংসদ সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো শর্ত নেই। তবে গত বছর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে সংসদ সদস্য প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণের দাবি ওঠে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সালাহউদ্দিন রিগ্যান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, সংসদের মানোন্নয়নের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ জরুরি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, একাডেমিক শিক্ষাই সংসদকে কার্যকর করবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁদের মতে, গণতান্ত্রিক চর্চা, নৈতিক রাজনীতি এবং জনস্বার্থ রক্ষায় শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জবাবদিহি এবং জনগণের সঙ্গে বাস্তব সংযোগ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, এখন পিয়ন পদের জন্যও এমএ পাস প্রার্থীরা আবেদন করেন। সংসদ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রার্থী থাকা মানেই যে সংসদের মান বাড়বে, এমনটি বলা যায় না। তাঁর মতে, সংসদে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইন প্রণয়নের প্রজ্ঞা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষের।

