শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একের পর এক করে সামনে আসছে রাষ্ট্রীয় লুটপাটের ভয়ংকর সব চিত্র। কোথাও ব্যাংক, কোথাও অবকাঠামো, আবার কোথাও প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলছে। তবে দুর্নীতির যে খাতটি সবচেয়ে ভয়াবহভাবে দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, তা হলো বিদ্যুৎ খাত।
এই খাতে এমন সব বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো বছরের পর বছর একটি ইউনিট বিদ্যুৎও উৎপাদন করেনি—তবুও সরকারকে দিতে হচ্ছে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা, শুধু ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামের এক অদৃশ্য খাতে।
খুলনার খালিশপুরে অবস্থিত নর্থওয়েস্ট পাওয়ারের ২৩০ মেগাওয়াট ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গত দুই বছরে একবারও চালু হয়নি। অথচ প্রতিমাসে সরকারকে দিতে হচ্ছে সাড়ে ১৬ কোটি টাকার বেশি। একই চিত্র ঘোড়াশালের রিজেন্ট ১০৮ মেগাওয়াট কেন্দ্রের—এক বছরে উৎপাদন সক্ষমতার ৩ শতাংশ বিদ্যুৎও গ্রিডে দেয়নি, কিন্তু মাসে নিচ্ছে ৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি বা দুটি নয়। বসে বসে ক্যাপাসিটি চার্জ নেওয়া এমন বহু কেন্দ্র মিলিয়ে সরকারের কাছ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—বিদ্যুৎ খাতের এই অনিয়মের ফলে লাভবান হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি। কিন্তু এর চাপ গিয়ে পড়ছে জাতীয় বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সাধারণ মানুষের ওপর।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পিডিবি বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় করেছে ৬ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জেই গেছে ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই অপ্রয়োজনীয় জায়গায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে—এই অজুহাতে বিশেষ আইনের আওতায় একের পর এক তেল ও গ্যাসভিত্তিক আইপিপি অনুমোদন দেওয়া হয়।
শ্বেতপত্র কমিটির সদস্য ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন,
“বিদ্যুৎ খাতে এতদিন প্রকাশ্যেই ডাকাতি হয়েছে। যেসব কেন্দ্র ৪০ শতাংশের কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, সেগুলোর কোনো প্রয়োজনই নেই। অথচ সেগুলোর পেছনে নিয়মিত টাকা দেওয়া হয়েছে।”
২০১৮ সালে ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রকল্পের নামে কোনো টেন্ডার ছাড়াই পাঁচটি ব্যয়বহুল ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো প্যারামাউন্ড-বাংলাট্রেক ২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র।
এই কেন্দ্রটি পাঁচ বছরে উৎপাদন করেছে মাত্র ৩১ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ, কিন্তু বিল নিয়েছে ২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৫ টাকা ২৪ পয়সা—যেখানে পিডিবি গড়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মাত্র ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পর্যালোচনা কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—বিদ্যুৎ খাতের এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, কয়েকজন সচিব এবং পিডিবির সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর খান জানিয়েছেন,
“বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ আছে। সরকার প্রাথমিকভাবে একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। পাশাপাশি আইপিপিগুলোকে বিদ্যুৎ বিক্রির দাম কমাতে চিঠি দেওয়া হচ্ছে।”
শ্বেতপত্র কমিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিদ্যুতের চাহিদা অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেখিয়ে বিশেষ আইনে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ার ফলেই উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
যেখানে ২০২০-২১ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ছিল ৬.৬১ টাকা, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১.৫১ টাকা।
এর পরিণতি ভোগ করছে পুরো দেশ—বাজেট ঘাটতি, ভর্তুকির চাপ এবং সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলের বোঝা বেড়েই চলেছে।

