দেশজুড়ে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এলপি গ্যাসের তীব্র সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আসলে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি—বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অব্যবস্থাপনা, আমদানিনির্ভরতা ও নীতিগত গ্যাপের ফল এখন সামনে এসে পড়েছে।
বাংলাদেশে জ্বালানির ঘাটতি নতুন কিছু নয়। কখনো কম, কখনো বেশি—এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই দেশ চলেছে বছরের পর বছর। তবে এবারের মতো সংকট তুলনামূলকভাবে বিরল, আর তাই এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকে আমরা কতটা নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি।
বর্তমানে দেশের প্রধান তিনটি বাণিজ্যিক জ্বালানি হলো—প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেল এবং এলপি গ্যাস। এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি অংশ মাত্র দেশীয় উৎস থেকে আসে, তাও গত প্রায় এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশকে আমদানি করতে হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)।
এলপি গ্যাসের চিত্র আরও হতাশাজনক। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বছরে যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিশোধন হয়, সেখান থেকে পাওয়া প্রোপেন ও বিউটেন দিয়ে মোট চাহিদার ১ শতাংশেরও কম এলপি গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। অর্থাৎ দেশের বাজারে ব্যবহৃত ৯৯ শতাংশের বেশি এলপি গ্যাসের কাঁচামালই আমদানি করতে হয়। এই আমদানি ও বাজারজাতকরণ করছে ২৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আর জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন—সেটির শতভাগই আমদানিনির্ভর।
বিদেশি মুদ্রার সংকটে থাকা একটি দেশের জন্য এই মাত্রার আমদানিনির্ভরতা যে জ্বালানি নিরাপত্তাকে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, বর্তমান সংকট সেটিরই বাস্তব উদাহরণ। অথচ দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ—প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগ বছরের পর বছর অবহেলিত থেকেছে।
বর্তমান এলপি গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ সম্প্রতি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—এলপি গ্যাস আমদানি বাড়ানো, শুল্ক কমাতে এনবিআরকে অনুরোধ, এলসি খোলা সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো এবং বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি আমদানির অনুমতি দেওয়ার উদ্যোগ।
এ ছাড়া বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর বিষয়েও ভাবছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজন আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব, গণশুনানি ও সময়—যা সংকটের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারে না।
এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যেই আসলে সংকটের মূল কারণগুলো লুকিয়ে আছে। দ্রুত আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে—আগে আমদানি কম ছিল। কেন কম ছিল? আন্তর্জাতিক বাজারে মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধি, সময়মতো এলসি খোলার জটিলতা, জাহাজ সংকট—সবই সম্ভাব্য কারণ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ এলএনজি ও এলপি গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণে অনেক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া। এমন বাস্তবতায় জ্বালানির মতো কৌশলগত পণ্যের ক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতির বিকল্প নেই। কিন্তু সেই প্রস্তুতির ঘাটতিই আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি খাত সরকারের রাজস্ব আহরণের বড় উৎস। আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর শুল্ক, ভ্যাট, অগ্রিম আয়করসহ নানা কর বসিয়ে বিপুল রাজস্ব আদায় করা হয়। কাগজে-কলমে রাজস্ব বাড়লেও বাস্তবে তার বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে অনেক দেশই কর-শুল্ক কমিয়ে জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়—সংকট তৈরি হওয়ার পর চিন্তাভাবনা শুরু হয়। এটি জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতারই প্রতিফলন।
বড় কোম্পানিগুলো আমদানি বাড়ালেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম এখন বেশি। তার ওপর পরিবেশক ও খুচরা পর্যায়ে কমিশন বাড়ানোর বিষয়টি যুক্ত হলে খরচ আরও বাড়বে। ফলে শেষ পর্যন্ত এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম কতটা কমানো সম্ভব হবে—তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো—জনগণের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি দেখে অদূর ভবিষ্যতে সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি যাওয়ার আশা করাই কঠিন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা চোখে পড়েনি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যে ফাঁক বা গ্যাপ বারবার তৈরি হচ্ছে, সেটিই ধীরে ধীরে জ্বালানি খাতকে সংকটের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। এলপি গ্যাসের বর্তমান সংকট আমাদের সেই বাস্তবতার কথাই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।

