নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতাহার প্রকাশ করে। এতে তারা স্পষ্টভাবে জানায়, ক্ষমতায় এলে কোন নীতি ও কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। জনগণের জীবনমান উন্নয়নে তারা কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে এবং দেশের প্রশাসন কীভাবে পরিচালিত হবে তাও উল্লেখ করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এটি একটি স্বীকৃত ও প্রচলিত প্রথা। বাংলাদেশেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত এই ইশতাহার ঘোষণা করে থাকে।
নির্বাচনী ইশতাহার আসলে কী:
নির্বাচনী ইশতাহার হলো একটি রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র। এতে দলের আদর্শ, লক্ষ্য, নীতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।
ইশতাহারে শুধু সরকার গঠনের পরিকল্পনা নয়, বরং বিরোধী দল থাকলে গণতন্ত্র রক্ষায় কী ভূমিকা রাখবে তাও উল্লেখ থাকা উচিত। ভোটাররা বিভিন্ন দলের ইশতাহার পড়ে ও তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেন, কোন দলের প্রতিশ্রুতি তাদের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও মূল্যবোধের সঙ্গে বেশি মেলে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে ইশতাহার নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক হয়। কিন্তু আমাদের দেশে শীর্ষ পর্যায়ের এমন গঠনমূলক বিতর্ক খুব একটা দেখা যায় না। তবে প্রশ্ন থাকে, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে কি ব্যবধান থাকে?
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান:
বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, নির্বাচনের আগে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি ক্ষমতায় গেলে বাস্তবায়িত হয় না। সরকার নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলে সময় নেন বা পরবর্তী নির্বাচনে একই প্রতিশ্রুতি পুনরায় দেন। অনেক সময় এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যা বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলের ক্ষমতার বাইরে থাকে। এর বড় কারণ হলো, প্রতিশ্রুতি না রাখলেও কার্যকর কোনো জবাবদিহি ব্যবস্থা নেই।
গণমাধ্যম নিয়মিত প্রশ্ন তুলতে পারে, কোন প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোনটি হয়নি কেন। সংসদে বিরোধী দলও সরকারকে চাপ দিতে পারে। এতে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় সতর্ক হবে এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণে আগ্রহী হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে ইশতাহারের ঘাটতি:
জাতীয় নির্বাচনে ইশতাহারের গুরুত্ব থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর ব্যবহার সীমিত। অধিকাংশ প্রার্থী দলীয় ইশতাহারের ওপর নির্ভর করেন, ফলে এলাকার নির্দিষ্ট সমস্যা ও প্রয়োজন লিখিতভাবে প্রতিফলিত হয় না।
একটি এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, জাতিগোষ্ঠীর আনুপাতিক সংখ্যা, তাদের চাহিদা এবং জীবনযাপনের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় উন্নয়নের জন্য স্পষ্ট এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা থাকা জরুরি। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক চর্চায় এ ধরনের পরিকল্পিত ইশতাহার এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
বর্তমান আইন ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে জনগণের প্রধান জবাবদিহির মাধ্যম এখনো ভোট। অধিকাংশ দেশে, বাংলাদেশসহ, নির্বাচনী ইশতাহার আদালতের মাধ্যমে সরাসরি বলবৎযোগ্য নয়। ফলে সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে জনগণ সাধারণত পরবর্তী নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে জবাব দেয়। তবে এর পাশাপাশি গণমাধ্যম, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা, নাগরিক সমাজের চাপ এবং নির্বাচন কমিশনের নজরদারির মাধ্যমে সরকারের ওপর জবাবদিহির চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আইনি ঝুঁকি:
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, যুক্তরাজ্যে নির্বাচনী ইশতাহারে প্রতিশ্রুতির আর্থিক দিক ব্যাখ্যা করা বাধ্যতামূলক। ভুটানে নির্বাচন কমিশন ইশতাহার যাচাই করে অনুমোদন দেয়। তবে ভারতে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নির্বাচনী ইশতাহার আইনিভাবে বলবৎযোগ্য নয়।
নির্বাচনী ইশতাহারকে আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে জটিল আইনি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি যুক্ত। আদালতের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবর্তে লেনদেনমুখী হয়ে যেতে পারে। দলগুলো তখন ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট, সীমিত বা শর্তসাপেক্ষ ভাষায় প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে আইনগত দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যায়।
এতে বড় ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দলগুলো আইনি পরামর্শ ও তহবিলের সুবিধা নিয়ে এগিয়ে থাকবে। ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া, কোনো প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে দায় কার ওপর বর্তাবে, ক্ষতিপূরণ কীভাবে নির্ধারিত হবে, অথবা সংসদে গৃহীত আইনের সঙ্গে ইশতাহারের সংঘাত হলে কোনটি প্রাধান্য পাবে—এসব বিষয়ও স্পষ্ট নয়। জোট সরকারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের আলাদা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তবে আদালতের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক না করেও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনের সঙ্গে ইশতাহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে পারে। এতে জনগণ দেখতে পারবে কোন প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং কেন হয়নি। নির্বাচনী ইশতাহার কোনো সাধারণ কথার তালিকা নয়। এটি জনগণের প্রতি রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া একটি প্রকাশ্য অঙ্গীকার।
আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও এর নৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব গভীর। এই অঙ্গীকার ভঙ্গ হলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়। সেই আস্থাভঙ্গের রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত নেতাদেরই দিতে হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এটি একটি অটল বাস্তবতা, যা সব সময় স্মরণে রাখা উচিত।

