জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সাধারণত একটি রেওয়াজ অনুসরণ করা হয়। সেই সময়ে প্রার্থীদের নির্বাচনী সুবিধা নিতে বাধা দিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুযায়ী নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় না। তফসিল ঘোষণার পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)ও সাধারণত বসে না।
কিন্তু এবার প্রেক্ষাপট বদলেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আগের সরকারের মতো রেওয়াজে আটকে থাকছে না। জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেই আরও তিনটি একনেক বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এসব বৈঠকে মোট ৩২টি প্রকল্প অনুমোদনের পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমানিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের যুক্তি হলো, নির্বাচনের সময় হলেও এসব খাতের উন্নয়ন স্থগিত রাখা জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই প্রচলিত রেওয়াজের বাইরে গিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যমতে, তফসিল-পরবর্তী প্রথম একনেক সভা চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর আরও দুটি সভা হওয়ার কথা রয়েছে। কমিশনের একজন সচিব নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে জানিয়েছেন, তফসিল ঘোষণার পর একনেক সভা আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনি কোনো বাধা নেই। আগের সরকারগুলো নিজেদেরকে সাধু দেখাতে একনেক সভা করত না। কিন্তু কতটা বাস্তবসাধু ছিল, তা সকলের জানা।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার শুধু নির্বাচনী সরকার নয়। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জাতীয় একনেক সভা করার সিদ্ধান্ত প্রধান উপদেষ্টার।” তিনি জানান, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রকল্প অনুমোদন বা বাতিল করা সম্ভব হবে। তবে কোনো প্রকল্প এমন হবে না যা নির্দিষ্ট এলাকায় বা নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রভাব ফেলতে পারে। পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে একটি একনেক সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় বেশ কিছু প্রকল্প অনুমোদনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। এই সভার সভাপতিত্ব করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও একনেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এডিপির আকার ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এটি নেমে এসেছে ২ লাখ কোটি টাকায়। ২০১৫ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩টি বৈঠকে মোট ১৬৫টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এতে মোট ব্যয় নির্ধারণ হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। শুধুমাত্র ডিসেম্বরেই ৪০ প্রকল্পে ৬২ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকার ব্যয় অনুমোদিত হয়েছে, যা পুরো বছরে অনুমোদিত ব্যয়ের ৪৩ শতাংশ। এতে বিদ্যুৎ খাতের প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের ৩৫ হাজার কোটি টাকার বড় প্রকল্পও রয়েছে।
তবে প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়নের চিত্র উদ্বেগজনক। বিদায়ী বছরে এডিপি বাস্তবায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৯২ কোটি ১১ লাখ টাকায়। খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে করুণ অবস্থা স্বাস্থ্য খাতে, যেখানে বরাদ্দের মাত্র ১৪ শতাংশই ব্যয় হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের আগে হলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। এটি স্বচ্ছ ও জনস্বার্থমুখী উদ্যোগ।”

