রাজধানীর পল্টনে অবস্থিত জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমকে দেড়যুগ পর নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুসল্লিদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে নেওয়া এই উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের মাধ্যমে মসজিদটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯৯ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্রকল্প প্রস্তাবে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পাওয়া গেছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দিলে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে তিনতলা পর্যন্ত আধুনিক চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন করা হবে। মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দিকে নির্মিত হবে ৮০ ফুট উচ্চতার দুটি ফটক। উভয় পাশে থাকবে ১৬৪ ফুট উঁচু মিনার। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে তিনতলা আধুনিক মিলনায়তন।
নারী মুসল্লিদের জন্য নামাজের স্থান আধুনিকায়ন করা হবে। দক্ষিণ দিকে তাদের জন্য আলাদা সিঁড়ি বসানো হবে। অজুখানা আধুনিক করা হবে এবং টয়লেটগুলো নতুন করে সংস্কার করা হবে।
এ ছাড়া পশ্চিম দিকে ২০ ফুট এবং উত্তর দিকে ৩৩ ফুট প্রশস্ত হাঁটাপথ নির্মাণ করা হবে। চারতলা অফিস ভবন নির্মাণের পাশাপাশি মসজিদের সাউন্ড সিস্টেম উন্নত করা হবে। ভেতর ও বাইরে আলোকসজ্জা আধুনিক করা হবে। লিফট সংযোজন এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ভিআরএফ প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে। দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাও সংস্কার করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশি ও বিদেশি নান্দনিক মসজিদ পরিদর্শন করে সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বায়তুল মোকাররমকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পের কিছু ব্যয় খাত নিয়ে আপত্তি তোলে। এর মধ্যে ছিল অন্যান্য ভাতা, আপ্যায়ন খরচ, কুরিয়ার সার্ভিস বিল, অফিস ও স্টোর ভাড়া, আসবাব মেরামত ও সংরক্ষণ এবং ডিপিপি তৈরির ব্যয়। জনবলের গ্রুপ বিমা খাত বাদ দেওয়ার সুপারিশও করা হয়। এসব সুপারিশ মেনে সংশ্লিষ্ট ব্যয় খাত বাদ দিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
এ ছাড়া চুক্তিভিত্তিক গাড়ি সংগ্রহ, প্রচার ও বিজ্ঞাপন, বইপত্র ও সাময়িকী, মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি এবং অফিস সরঞ্জাম খাতের ব্যয় অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছিল কমিশন। এসব সমন্বয় করেই ১৯৯ কোটি টাকার চূড়ান্ত প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানায়, প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। পরে বিভিন্ন সংযোজন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কারণে ব্যয় বেড়ে ১৯৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে অনাবাসিক ভবন, মিনার ও ফটক নির্মাণে। বিদ্যুৎ সংযোগে ব্যয় হবে ৩১ কোটি টাকা এবং অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থায় সাত কোটি টাকা।
বিষয়টি নিয়ে কথা হলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক (পরিকল্পনা) বজলুর রশীদ বলেন, মদিনা শরিফের আদলে মসজিদের খোলা স্থানে ছাতা স্থাপনের একটি পরিকল্পনা ছিল। তবে বাস্তবতার কারণে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসা হয়েছে। তিনি বলেন, মসজিদটিকে আধুনিকভাবে ঢেলে সাজানো হবে এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে। তিনতলা পর্যন্ত চলন্ত সিঁড়ি নির্মাণ করা হবে। নিচের মার্কেট অংশে আলাদা টয়লেট এবং মুসল্লিদের জন্য পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থাও থাকবে।
বায়তুল মোকাররম মসজিদের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। সে সময় তৎকালীন পাকিস্তানের শিল্পপতি আব্দুল লতিফ ইবরাহিম বাওয়ানি ঢাকায় একটি বড় গ্র্যান্ড মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। ওই বছরই ‘বায়তুল মোকাররম মসজিদ সোসাইটি’ গঠন করে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে মসজিদের জন্য জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়।
পবিত্র কাবা শরিফের আদলে নির্মিত মসজিদটির নকশা করেন স্থপতি টি আব্দুল হুসেন থারিয়ানি। কমপ্লেক্সের নকশায় দোকান, অফিস, পাঠাগার, অডিটোরিয়াম ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়। ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৬২ সালের ২৬ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটি উদ্বোধন করা হয়।
বর্তমানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এই মসজিদেই অবস্থিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষ। এখানেই চাঁদ দেখা ও হিজরি সন নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতার বাছাইপর্বসহ নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয় এই মসজিদের অডিটোরিয়ামে।

