আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরেই বাড়ছে অস্বস্তি ও উদ্বেগ। অতীতের বিতর্কিত ভূমিকার ছাপ কাটিয়ে এবার একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের অংশীদার হতে চায় বাংলাদেশ পুলিশ। কিন্তু ভোটের দিন সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করা যাবে কি না—এই প্রশ্নই এখন পুলিশের ভেতরে বড় এক ভীতির জন্ম দিয়েছে।
পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং নানা অদৃশ্য নির্দেশনা পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সে কারণেই নির্বাচনের দিন আইন অনুযায়ী পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করার নিশ্চয়তা সরকার থেকে স্পষ্টভাবে চাইছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় বিষয়টি সরাসরি তুলে ধরেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তিনি বৈঠকে স্পষ্ট করে বলেন, রাজনৈতিক দল ও সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও স্বাধীনতা না পেলে ভোটের দিন চাপমুক্তভাবে কাজ করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হবে না। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শুধু নির্বাচন নয়, ভবিষ্যতে পুলিশের অস্তিত্ব ও জনআস্থা আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
এই প্রসঙ্গে আইজিপি বাহারুল আলম সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, পুলিশ বাহিনী একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে ভয় ও চাপমুক্ত পরিবেশ ছাড়া সেই প্রস্তুতি বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন। ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট ‘সবুজসংকেত’ চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল জয় নিশ্চিত করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে পারে। সেই চেষ্টায় কেউ কেউ সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে পুলিশকে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। তখন যদি সরকার পুলিশকে পিছু হটার নির্দেশ দেয়, তাহলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। এর সঙ্গে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচন বানচালের চাপও একটি বাড়তি উদ্বেগ হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা রেঞ্জের এক পুলিশ সুপার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর থেকে সমাজের একটি অংশ পুলিশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে মানতে চাইছে না। অনেকের ধারণা, তারা অন্যায় করলেও পুলিশের কিছু বলার অধিকার নেই। এই মানসিকতা থেকেই আইনের আওতায় রাখতে গেলেই পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, নির্বাচনের দিন যদি কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আর পুলিশের কাছে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মাঠে পুলিশের উপস্থিতি অর্থহীন হয়ে যাবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা আইনের ভেতরে থেকে দেশের পক্ষে কাজ করার নিশ্চয়তা চাই।”
সম্প্রতি হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে আটকের পর আদালতে হাজির করা নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেটিও পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। থানার সামনে শতাধিক নেতা-কর্মী অবস্থান নিয়ে রাতেই আদালত বসিয়ে জামিন শুনানির দাবি জানান। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, এসব ঘটনায় চাপ থাকলেও শেষ পর্যন্ত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই পুলিশের দায়িত্ব—এবং সেটিই তারা করেছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করেন, ছোট ছোট ঘটনায় ছাড় দিলে বিশৃঙ্খলাকারীরা আরও বড় মব গঠনের সাহস পায়। সে কারণেই নির্বাচনের আগে কাউকে রাজনৈতিক বা সরকারি কোনো ধরনের বেআইনি ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এই বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রেঞ্জ ও জেলা পর্যায়ে কঠোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬৬টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ১৬ হাজার ৬৭৫টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৭ হাজারেরও বেশি।
এই তালিকায় ঢাকা বিভাগ ও ঢাকা মহানগরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র রয়েছে চট্টগ্রামে। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর যৌথভাবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে। অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর জন্য বডি ক্যামেরা কেনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা জেলা পুলিশ নিজস্ব অর্থায়নে সংগ্রহ শুরু করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নির্বাচনের দিন প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১৩ জন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে থাকবেন ৩ জন অস্ত্রধারী, ৬ জন অস্ত্রবিহীন পুরুষ এবং ৪ জন অস্ত্রবিহীন নারী পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যে ১ লাখ ৩৩ হাজার সদস্যের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাষায়, পুলিশ যদি আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে নির্বাচনী মাঠে কাজ করতে না পারে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নেওয়া সব প্রস্তুতিই অর্থহীন হয়ে যাবে।
বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, ভোটাররা যেন নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন—এটাই পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। দল-মত নির্বিশেষে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, পুলিশের হাতে পূর্ণ স্বাধীনতা না দিলে নির্বাচন ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। তাঁর মতে, যেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করুক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের পূর্ণ ক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। পুলিশকে পুলিশের মতো কাজ করতে না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
এদিকে নির্বাচন ঘিরে চোরাগোপ্তা হামলা, গুলি, হত্যা, বিস্ফোরণ, মব সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই গুলি করে চারটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে।
প্রার্থীদের মধ্যেও এই উদ্বেগ স্পষ্ট। গোপালগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী এস এম জিলানীর বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে এক সমাবেশে সহিংসতা ও অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যদিও তিনি আশা করেন—নির্বাচনের সময় পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
সব মিলিয়ে, ভোটের মাঠে পুলিশের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা না গেলে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাই বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

