২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সময়ের আওয়ামী শাসনের পতনের সঙ্গে বাংলাদেশ এখন সংকটময় এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। দেশকে স্থিতিশীল করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিকীকরণের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করেছে। এটি ছিল ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের একটি মূল বৈশিষ্ট্য।
গত প্রায় দেড় বছরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গভীর আলোচনা হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। সেটি হলো রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বাস্তবতা। এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আর্থিক সামর্থ্য যখন রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পূর্বশর্তে পরিণত হয়, তখন আদর্শ, যোগ্যতা ও জনগণের অংশগ্রহণ অর্থশক্তির কাছে হেরে যায়।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ওয়েস্টমিনস্টার ফাউন্ডেশন ফর ডেমোক্রেসি তাদের ‘দ্য কস্ট অব পলিটিকস ইন বাংলাদেশ’ (ফেব্রুয়ারি, ২০২৫) শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যয়ের ক্রমবর্ধন যদি রোধ করা না হয়, তবে অর্থবহ সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। গবেষণায় শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও দেখা গেছে যে রাজনৈতিক অর্থায়নের বৃদ্ধি দুর্নীতি ও বঞ্চনাকে স্থায়ী করে দেয়। এতে গণতান্ত্রিক সংকট আরও গভীর হয়।
রাজনীতিতে অর্থশক্তির ছায়া:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল বহু বছর ধরে পৃষ্ঠপোষকতামূলক নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে আনুগত্য, স্থানীয় প্রভাব ও আর্থিক সামর্থ্যই রাজনৈতিক সাফল্যের মূল নির্ধারক। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে দেশের রাজনীতি গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও কর্তৃত্ববাদী হস্তক্ষেপের চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিভিন্ন সময়ে সামরিক হস্তক্ষেপ, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে অনিয়ম, ভোট বর্জন এবং প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ঘিরে দ্বান্দ্বিক অবস্থান, দুই প্রধান রাজনৈতিক দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বৈত আধিপত্য এবং রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থের ঘনিষ্ঠ মেলবন্ধন এই সংকটকে আরও জটিল করেছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডব্লিউএফডি দেখিয়েছে, এই পরিস্থিতি রাজনীতিকে মূলত ধনিক শ্রেণির বিনিয়োগের খাতে পরিণত করেছে। ব্যবসায়ী, আমলা এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। তৃণমূল নেতৃত্ব ক্রমেই নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ব্যবসা ও রাজনীতির মিশ্রণ সাধারণ নাগরিকদের জন্য রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ আরও সংকুচিত করেছে। আইনসভা মূলত বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তৈরি পোশাক, রিয়েল এস্টেট, অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাত তাদের রাজনৈতিক প্রাধান্য বাড়িয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রিপোর্ট অনুযায়ী, সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদে মোট সদস্যদের ৬৭ শতাংশই ব্যবসায়ী। একাদশ জাতীয় সংসদে এ সংখ্যা ছিল ৬২ শতাংশ, আর প্রথম জাতীয় সংসদে ছিল ১৮ থেকে ২৪ শতাংশ।
রাজনীতিতে অর্থায়নের স্বচ্ছতা বাড়াতে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মহা হিসাব নিরীক্ষক দপ্তর সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। প্রার্থীদের অর্থায়নের উৎস জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি করা দরকার। উদাহরণস্বরূপ, মনোনয়ন শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করা যেতে পারে।
নির্বাচনে অর্থের আধিপত্য:
বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার অনেক আগেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বছরের পর বছর ধরে সম্পর্ক গড়ে তোলা, দলীয় আনুগত্য দেখানো, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় এবং বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হয়।
দলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ের সাক্ষাৎকারে প্রায়ই আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে। যারা নিজ খরচে সভা-সমাবেশ আয়োজন বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান করতে পারেন, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে একাধিক আগ্রহী প্রার্থী মনোনয়নের প্রতিযোগিতা জটিল করার পাশাপাশি খরচ ও আনুগত্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতাও বাড়িয়ে দেন।
মনোনয়ন পাওয়ার পর প্রচারণা আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। পোস্টার ও প্রচারসামগ্রী, কর্মীদের হাতখরচ, পরিবহন, গণসংযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিজিটাল প্রচারণার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। প্রতিযোগিতামূলক আসনে ভোটার আকৃষ্ট করতে ব্যয় আরও বেড়ে যায়। নির্বাচনের দিনেও ভোটারদের কেন্দ্রে আনা–নেওয়া, নিরাপত্তা, নজরদারি এবং ভোটকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের জন্য খরচ বাড়ে।
নির্বাচনের পরে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প, দলীয় অনুদান, অফিস পরিচালনা, সামাজিক অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানে অনুদান এবং জনসংযোগ বজায় রাখতে সংসদ সদস্যদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ অর্থ প্রায়ই অনানুষ্ঠানিক বা অনৈতিক উৎস থেকে আসে। ফলে সংসদ সদস্যরা আইনপ্রণেতা বা নীতিনির্ধারক হওয়ার বদলে স্থানীয় উন্নয়নের এজেন্টে পরিণত হন।
অর্থ বাধা দিচ্ছে গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ:
রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্বের পথে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। নারী, তরুণ এবং প্রান্তিক জনপদের প্রার্থীদের জন্য এই ব্যয় বহন করা কঠিন। দলীয় গঠনতন্ত্র ও আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী সদস্য রাখার বিধান থাকলেও সরাসরি নির্বাচনে নারীদের অগ্রগতি খুবই কম।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডব্লিউএফডি জানিয়েছে, আর্থিক সক্ষমতার অভাবে নারীরা মনোনয়ন পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। পারিবারিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকলে রাজনীতিতে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তরুণ প্রার্থীরাও একই সমস্যার মুখোমুখি। সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং রাজনৈতিক দলের কাঠামো তাদের মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশকে কঠিন করে তোলে।
এ ছাড়া সমাজে প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে নেতৃত্ব কেবল ‘বয়স্ক বা অভিজ্ঞদের’ জন্য। তবুও চব্বিশ পরবর্তী বাংলাদেশে কিছু তরুণ নেতা সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত দেখিয়েছেন। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের তরুণ নেতাদের সঙ্গে ডব্লিউএফডির আলোচনায় যোগ্যতা ও মেধাভিত্তিক রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
অর্থশক্তি দখল করছে ক্ষমতা:
ব্যয়নির্ভর রাজনীতি গভীর অসমতা তৈরি করে এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করে। এর প্রভাবে ধনীরা রাজনীতির দখল নেয়, তৃণমূল নেতৃত্ব উপেক্ষিত হয়, এবং জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ প্রাধান্য পায়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা খরচ পুষিয়ে নিতে সরকারি প্রকল্প ও সুযোগ সুবিধা বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব প্রয়োগ করেন। উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বণ্টিত হয়। এতে ঘুষ–নির্ভরতা ও অন্যায্যতা বৃদ্ধি পায়।
ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বিভিন্ন খাতে নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করে, যা সংসদের চরিত্র ক্রমে অভিজাততান্ত্রিক করে তোলে। রাজনীতিতে অপরাধী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পায়, বিশেষত সীমান্ত এলাকায়, যেখানে পাচার ও মাদক চক্র রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সমর্থন নিয়ে প্রভাব বিস্তার করে। নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, প্রাণহানি এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে, যা নির্বাচনকে জনগণের কাছে ভয়ের উৎসে পরিণত করে। এর ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি নাগরিকের আস্থা কমে যায় এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা তৈরি হয়।
উগান্ডার ডব্লিউএফডি গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রাজনৈতিক ব্যয়ের সঙ্গে ভোটারবিমুখতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবশেষ কয়েকটি নির্বাচনে ক্রমহ্রাসমান ভোটার উপস্থিতি এবং নির্বাচনে নাগরিকদের অনাগ্রহের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থের আন্তসম্পর্ক এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ব্যয়কে দায়ী করা যায়।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির জন্য সংস্কার জরুরি:
এই চক্র ভাঙতে সরকারকে সার্বিক সংস্কার উদ্যোগ নিতে হবে। আইন প্রয়োগকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনী ব্যয়ের বাস্তবসম্মত সীমা নির্ধারণ, প্রান্তিক প্রার্থীদের জন্য দলীয় ও সরকারি সহায়তা চালু এবং স্বচ্ছ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আয়–ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক হতে হবে।
নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মহা হিসাব নিরীক্ষক দপ্তরের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করলে তদারকি আরও ফলপ্রসূ হবে। প্রার্থীদের অর্থায়নের উৎস জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, মনোনয়ন শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করা যেতে পারে। সব অনুদান রিয়েল-টাইম ডিজিটাল রিপোর্টিংএর আওতায় থাকবে। আয়–ব্যয়ের হিসাব স্বাধীন সংস্থা দ্বারা যাচাইযোগ্য হবে এবং কঠোর শাস্তির বিধান থাকবে। বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রার্থিতা বাতিল ও সম্পদ জব্দের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা বিকাশ করা জরুরি। তরুণ নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ এবং গণসংলাপকে উৎসাহ দিতে হবে। দলীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে গোপন ব্যালটে অভ্যন্তরীণ নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা এবং যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। নারী ও তরুণদের জন্য যোগ্যতা ও মেধাভিত্তিক মনোনয়ন কোটা ব্যবস্থা করা দরকার।
ব্যবসায়ী বা আমলাদের রাজনীতিতে প্রবেশের আগে নির্দিষ্ট ‘কুলিং-অফ’ বা বিরতি পর্ব প্রয়োগ করা যেতে পারে। নির্বাচনী প্রচারণার ব্যয়বহুল পদ্ধতির পরিবর্তে অনলাইন প্রচারণাকে উৎসাহিত করতে হবে এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনের ব্যয়ে সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কমিউনিটি বেজড অর্গানাইজেশন (সিবিও) ও ছাত্রসংগঠনগুলোর সহযোগিতায় নাগরিকদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও শিক্ষিত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি পরিবর্তন আনতে পারে। এখন প্রয়োজন সেই শক্তিকে টেকসই সংস্কারের দিকে পরিচালিত করা। রাজনীতির ব্যয়কেন্দ্রিক সংকট মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ আবারও একই চক্রে আবর্তিত হবে, যেখানে নামে গণতন্ত্র থাকলেও ক্ষমতা থাকবে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের জন্য টেকসই সংস্কার বিকল্প নয়, বরং অত্যাবশ্যক।

