বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসার দ্বার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার কিছু দেশ বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে কড়াকড়ি ও শর্ত আরোপ করেছে। বিদেশে ভুয়া কাগজপত্র জমা, ফিরে না আসা এবং মানব পাচারের কারণে বিদেশি দেশে বাংলাদেশিদের প্রতি আস্থা কমে গেছে। এর ফলেই দেশের অভিবাসন খাত গভীর সংকটে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদনে প্রায় ১৮ লাখ টাকার বন্ড বা জামানত প্রথা চালু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন করে ভিসা প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে। এর ফলে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প সরকারের কঠোর পদক্ষেপে অনুন্নত দেশগুলোকে টার্গেট করা হলেও বাংলাদেশের নামও তালিকায় থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন বাংলাদেশি ভিসাপ্রার্থী বিদেশি দূতাবাস ও ভিসা সেন্টারগুলোর কাছে এক আতঙ্কের মতো।
অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, এবং প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, সমস্যার মূল দায় দেশের অভিবাসীদেরই কিছু অংশের উপর।
ঢাকায় নিযুক্ত এক বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তা জানালেন, বাংলাদেশি ভিসাপ্রার্থীদের জন্য দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, “আমরাও ভিসানীতি কঠোর করেছি। ধীরে ধীরে আরও অনেক দেশ বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করবে। বাংলাদেশি ভিসাপ্রার্থীরা ভুয়া ডকুমেন্টস জমা দেয় বা ভিসা নিয়ে ফিরে আসে না। এতে আমাদের দেশে দূতাবাসগুলো শঙ্কিত।”
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন দ্বার বাংলাদেশিদের জন্য এখন বন্ধ। মানব পাচারের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের কারণে ইউরোপের দেশগুলোও ভিসা দেওয়া কমিয়েছে। তারা এসব অবৈধ বাংলাদেশিকে ফেরত নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় কমিশন ও ইতালি সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও অন্যান্য ইইউ দেশগুলোও কঠোর অভিবাসন নীতি প্রণয়ন করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপ বাংলাদেশের কর্মীদের ভিসা ঠিকমতো দিচ্ছে না। পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়াও বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর করেছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, “আমরা বারবার অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া বন্ধের চেষ্টা করছি। তবে কিছু দালালের প্রলোভনে পড়ে বাংলাদেশিরা ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ যাচ্ছেন। অনেকেই নৌকাডুবি বা কারাগারে আটকা পড়ছেন। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা চাই, বৈধ পথে বিদেশ পাঠানো হোক।”
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “বাংলাদেশের অভিবাসন খাতে ব্যাপক দুর্নীতি রয়েছে। জাল ভিসা ও ডকুমেন্ট জমা দেওয়া হয়, ভিসা নিয়ে কেউ বিদেশে কাজ পায় না, কেউবা অবৈধভাবে দেশ ছাড়ে। এতে অনেক দেশ কঠোর ভিসানীতি গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবও বাড়ছে। বাংলাদেশের অভিবাসন খাত বর্তমানে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল। এককেন্দ্রিক নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।”
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষ, প্রযুক্তি ও ভাষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ প্রস্তুত নয়। মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বড় শ্রমবাজার বন্ধ। নতুন শ্রমবাজার গঠনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত। দেশে দক্ষ কর্মীর অভাবে শিল্পে উৎপাদনশীলতা কমছে ও বেকারত্ব বাড়ছে। ফলে বৈদেশিক আয় ও রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করা হলেও সাড়া আসছে না। আরব আমিরাতে ভুয়া কাগজপত্র জমা দেওয়ার অভিযোগ আসে। মালয়েশিয়ার বাজারও সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে বন্ধ। ইউরোপের দেশগুলো অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত নেওয়ার চাপ দিচ্ছে। ইতালিতে আড়াই লাখ, ফ্রান্সে এক লাখ, স্পেনে ৬০ হাজার, গ্রিসে ৪০ হাজার, জার্মানিতে ২৫ হাজার, অন্য ইউরোপীয় দেশে কমপক্ষে ২৫ হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন। যুক্তরাজ্যে প্রায় আট লাখ বাংলাদেশি আছেন, অধিকাংশই অবৈধ। এই সব দেশে বাংলাদেশকে দ্রুত প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা করতে বলা হচ্ছে।

