বর্তমান সময়ে শহুরে পরিবারগুলো গ্যাস সংকট, সিলিন্ডারের ঘাটতি, দাম বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে রান্নার জন্য বিকল্প খুঁজছেন। সেই বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বৈদ্যুতিক চুলা, বিশেষ করে ইন্ডাকশন এবং ইনফ্রারেড চুলা। দুই ধরনের চুলা এক নজরে একই রকম মনে হলেও, তাদের কাজের পদ্ধতি, সুবিধা, নিরাপত্তা এবং ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। তাই আপনার রান্নাঘরে কোন চুলা সবচেয়ে মানানসই হবে, তা জানতে হলে প্রথমে তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝা জরুরি।
ইন্ডাকশন চুলা: দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ
ইন্ডাকশন চুলা কাজ করে চুম্বকীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে। অর্থাৎ চুলার উপরের অংশ সরাসরি গরম হয় না; গরম হয় কেবল হাঁড়ি বা কড়াইয়ের তল। এ কারণে রান্নার সময় চুলার পৃষ্ঠ তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা থাকে, ফলে পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
সুবিধা:
-
রান্নার গতি অত্যন্ত দ্রুত। পানি ফুটানো বা তরকারি রান্নার সময় সাধারণ চুলার চেয়ে অনেক কম।
-
শক্তি অপচয় কম, কারণ তাপ সরাসরি পাত্রে তৈরি হয়। বিদ্যুৎ খরচও তুলনামূলক কম।
-
শিশুদের জন্য নিরাপদ, কারণ চুলা পাত্র ছাড়া গরম হয় না।
-
পরিষ্কার করা সহজ; কেবল পাত্রের তলা মুছলেই চলবে।
সীমাবদ্ধতা:
-
সব ধরনের হাঁড়ি বা পাত্রে কাজ করে না। শুধুমাত্র চুম্বকীয় পাত্র, যেমন লোহার বা স্টেইনলেস স্টিলের বাসন ব্যবহার করতে হবে।
-
বিদ্যুৎ চলে গেলে রান্না থেমে যায়।
ইনফ্রারেড চুলা: বহুমুখী ও সহজ ব্যবহারযোগ্য
ইনফ্রারেড চুলা কাজ করে তাপ রশ্মি বা ইনফ্রারেড কিরণের মাধ্যমে। চুলার ভেতরের হিটিং এলিমেন্ট লাল হয়ে জ্বলে ওঠে এবং সেই তাপ পাত্রের নিচে ছড়িয়ে রান্না হয়। গ্যাস চুলার মতোই খাবার সমানভাবে গরম হয়, তবে আগুন ছাড়া।
সুবিধা:
-
প্রায় সব ধরনের পাত্র ব্যবহার করা যায়—স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, কাচ, সিরামিক, মাটির হাঁড়ি। আলাদা করে পাত্র কেনার দরকার নেই।
-
বিদ্যুৎ ওঠানামা হলেও রান্না তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হয়।
-
বড় এবং ভারি পাত্রে রান্নার সুবিধা বেশি।
সীমাবদ্ধতা:
-
ইন্ডাকশন চুলার তুলনায় বিদ্যুৎ খরচ বেশি।
-
চুলার কাচের উপরের অংশ গরম থাকে, তাই স্পর্শে সতর্ক থাকতে হবে।
-
তাপ ধীরে কমে, তাই নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগের প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও রান্নার দক্ষতা
-
ইন্ডাকশন চুলা: প্রায় ৮৫–৯০% শক্তি সরাসরি রান্নায় ব্যবহার হয়। ফলে বিদ্যুৎ খরচ কম এবং রান্না দ্রুত।
-
ইনফ্রারেড চুলা: প্রায় ৬৫–৭০% দক্ষতায় কাজ করে। বিদ্যুৎ খরচ বেশি, রান্নার তাপ নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক ধীর।
পাত্র নির্বাচন এবং নিরাপত্তা
ইন্ডাকশন চুলা শুধুমাত্র চুম্বকীয় পাত্রে কাজ করে। পাত্রের তলা সমতল এবং পরিষ্কার না হলে চুলা চালু হয় না। পাত্র ছাড়া চালালে চুলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইনফ্রারেড চুলায় পাত্রের ধরনের কোনো বিধিনিষেধ নেই, তবে তাপ সঠিকভাবে ছড়াতে তলার সমতলতা গুরুত্বপূর্ণ। কাচের প্লেট কিছু সময় গরম থাকে, তাই স্পর্শের সময় সতর্ক থাকতে হবে।
সাধারণ নিরাপত্তা পরামর্শ:
-
রান্নাঘর শুষ্ক ও পরিষ্কার রাখুন।
-
চুলার পাশে দাহ্য বস্তু রাখবেন না।
-
রান্না শেষে চুলা বন্ধ করে প্লাগ খুলে রাখুন।
-
শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।
-
কাচের প্লেট নরম কাপড় দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
কোন চুলা আপনার জন্য সেরা?
-
যদি আপনার প্রধান লক্ষ্য দ্রুত রান্না, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং নিরাপত্তা, বিশেষ করে শিশু ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—তাহলে ইন্ডাকশন চুলা আদর্শ।
-
যদি আপনার রান্নার পাত্রগুলো বিভিন্ন ধরনের, যেমন অ্যালুমিনিয়াম, মাটির হাঁড়ি বা কাচের বাসন—এবং গ্যাস চুলার মতো সমানভাবে রান্না করার সুবিধা চান—তাহলে ইনফ্রারেড চুলা বেশি উপযোগী।
উভয় চুলাই পোর্টেবল এবং বাজারে ১৮০০–২২০০ ওয়াটের মডেলে প্রায় ৩–৫ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। সুতরাং আপনার রান্নার ধরন, পাত্রের ধরন এবং পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী বেছে নিন।
এভাবে, গ্যাস সংকট এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের যুগেও, আপনার রান্নাঘরে আধুনিক, নিরাপদ এবং সুবিধাজনক বিকল্প নিয়ে আসা সম্ভব।

