ভাসানচরের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটেছে। ভূমি মন্ত্রণালয় চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, ভাসানচরের ৬টি মৌজা চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্গত। এর মাধ্যমে নোয়াখালীর হাতিয়া ও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার মধ্যে চলমান সীমানা বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হলো।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের গঠিত কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়। মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়, সরেজমিন তদন্ত, ঐতিহাসিক নথি এবং আধুনিক প্রযুক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে ভাসানচরকে সন্দ্বীপ উপজেলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের অধীনে গঠিত কারিগরি কমিটি ভাসানচরের সীমানা নির্ধারণে একাধিক ধাপে কাজ করে। এই কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার, দুই জেলার জেলা প্রশাসক, সন্দ্বীপ ও হাতিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এবং দুই উপজেলা থেকে তিনজন করে পেশাজীবী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
গত ৯ মার্চ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সিএস ও আরএস জরিপ নথি, দিয়ারা জরিপ, বন বিভাগের তথ্য এবং স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাসানচরের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা হবে। এসব উপাত্ত পর্যালোচনা শেষে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে ভাসানচরের ছয়টি মৌজাকে সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখানো হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয় সেই প্রতিবেদন অনুমোদন করে চূড়ান্ত নির্দেশনা জারি করে। প্রশাসনিকভাবে ভাসানচরের অবস্থান নির্ধারণে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভাসানচরের ইতিহাস সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসনিক নথি অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের দিকে ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন ভয়াবহ নদীভাঙনে সম্পূর্ণভাবে সাগরে বিলীন হয়ে যায়। ওই এলাকার হাজারো মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে সন্দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেন।
ভাঙনের কয়েক বছরের মধ্যেই একই স্থানে নতুন করে চর জেগে ওঠে। সন্দ্বীপের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে এই নতুন ভূমি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। বন বিভাগের তথ্য বলছে, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই সেখানে নতুন ভূমির অস্তিত্ব দৃশ্যমান ছিল।
স্থানীয়ভাবে এই চর দীর্ঘদিন ‘ঠ্যাঙ্গারচর’ নামে পরিচিত ছিল। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন প্রকল্পের সময় দ্বীপটির নাম পরিবর্তন করে ‘ভাসানচর’ রাখা হয়। এরপর থেকেই দ্বীপটি জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে।
২০১৭ সালে দিয়ারা জরিপের মাধ্যমে সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে, যেখানে ভাসানচরকে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অংশ হিসেবে দেখানো হয়। এতে সন্দ্বীপবাসীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তাদের দাবি ছিল, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে ভাসানচর সন্দ্বীপেরই অংশ।
পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ভাসানচর থানা গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানেও দ্বীপটিকে হাতিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হলে সন্দ্বীপে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। ছাত্র, পেশাজীবী, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন।
সন্দ্বীপের বাসিন্দা মনিরুল হুদা বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। আদালত নির্বাহী বিভাগকে সীমানা জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দিলেও তা দীর্ঘদিন বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বিরোধ আরও জটিল হয়।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাহী বিভাগ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে ১৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিই শেষ পর্যন্ত ভাসানচরকে সন্দ্বীপ উপজেলার অংশ হিসেবে নির্ধারণ করে।
সীমানা বিরোধ চলাকালীন সময়ে দুই জেলার মানুষ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। গত ৭ এপ্রিল এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাসানচরকে হাতিয়ার অংশ দাবি করে পোস্ট দিলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
একই সময়ে হাতিয়া দ্বীপ সমিতির উদ্যোগে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে ভাসানচরকে হাতিয়া উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হয়। চট্টগ্রামেও হাতিয়াবাসীর পক্ষ থেকে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে চর জাগা ও নদীভাঙন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রচলিত ভূমি আইন অনুযায়ী, কোনো ইউনিয়ন বা মৌজা ভেঙে গিয়ে পরে একই স্থানে নতুন ভূমি জাগলে সেটি সাধারণত পূর্ববর্তী এলাকার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়। তবে দিয়ারা জরিপ ও প্রশাসনিক সীমা নির্ধারণে অস্পষ্টতার কারণে প্রায়ই বিরোধ তৈরি হয়।
সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মংচিংনু মারমা বলেন, ভাসানচর নিয়ে সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ছিল। প্রশাসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মানুষ স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করছে। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে পরবর্তী নির্দেশনা এলে আমরা প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করব।

