চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য, সার ও শিল্পের কাঁচামাল বহনকারী ৮৫টির বেশি জাহাজ সাগরে অপেক্ষমাণ থাকলেও লাইটার জাহাজ সংকটে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। এতে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের ড্যামারেজ গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ শুধু লাইটার জাহাজের স্বল্পতা নয়; বরং অব্যবস্থাপনা ও লাইটার জাহাজের অপব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে খাদ্যশস্য বহনকারী বহু লাইটার জাহাজ নির্ধারিত গন্তব্যে গিয়ে পণ্য খালাস না করে সাগরেই অবস্থান করছে। অনেক আমদানিকারক এসব জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে খালাস শেষে জাহাজগুলো মূল রুটে ফিরে আসতে পারছে না। ব্যবসায়ী মহলের ভাষ্য, এটি পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি হওয়া একটি কৃত্রিম সংকট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বড় শিল্প গ্রুপগুলো নিজস্ব লাইটারেজ জাহাজ ব্যবহার করে পণ্য খালাস করলেও অন্যান্য আমদানিকারককে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) থেকে জাহাজ বরাদ্দ নিতে হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় জাহাজ না থাকায় অর্ধশতাধিক মাদার ভেসেলের পণ্য খালাস কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস সূত্র জানায়, স্বাভাবিক সময়ে একটি মাদার ভেসেল ৫০ হাজার টনের মতো পণ্য নিয়ে এলে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই খালাস শেষ হয়। বর্তমানে লাইটার জাহাজ সংকটে সেই সময়সীমা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। অনেক জাহাজকে ২০ থেকে ৩০ দিন বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এমনকি কিছু জাহাজ কয়েক দিন ধরেও এক টন পণ্য খালাস করতে পারছে না।
শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ প্রতিটি মাদার ভেসেলের জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ড্যামারেজ দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএইচবিওএ) সভাপতি সরওয়ার হোসেন সাগর বলেন, “জাহাজ দ্রুত আসছে, কিন্তু খালাসের সক্ষমতা নেই। প্রতিদিন স্বাভাবিক পণ্য প্রবাহ বজায় রাখতে যেখানে ২০০ থেকে ৩০০ লাইটার জাহাজ প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০টি। এতে পুরো খালাস ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে।”
অন্যদিকে বিডব্লিউটিসিসি এই সংকটের জন্য ঘন কুয়াশা এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সারের কাজে নিয়োজিত ১৪০টি জাহাজ আটকে থাকাকে দায়ী করেছে। তবে আমদানিকারক ও অপারেটরদের দাবি, কুয়াশার প্রভাব সাময়িক হলেও মূল সমস্যা দুর্বল ব্যবস্থাপনা। তারা সংকট নিরসনে বিদ্যমান জাহাজ সিরিয়াল প্রথা বাতিল করে উন্মুক্ত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগংয়ের (আইভোয়াক) সহসভাপতি পারভেজ আহমেদ বলেন, বিডব্লিউটিসিসির অধীনে একসময় প্রায় ১ হাজার ২০০টি লাইটার জাহাজ ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি জাহাজ মোংলা বন্দরে চলে গেছে। পাশাপাশি ৬৮৭টি জাহাজ বহির্নোঙর থেকে পণ্য বোঝাই শেষে খালাস না করে দীর্ঘদিন ফিরে না আসায় চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, সাধারণত একটি লাইটার জাহাজের বহির্নোঙর থেকে ঘাটে পণ্য এনে খালাস করতে ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৫ দিন সময় লাগে। কিন্তু বর্তমানে একেকটি লাইটার জাহাজ এক থেকে দেড় মাস ধরে পণ্য খালাস না করেই পড়ে আছে।

