আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশে ছয় হাজার ৭৪৮টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এসব কেন্দ্রে পেশিশক্তির প্রভাব, দুর্গম অবস্থান, থানা থেকে দূরত্ব, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কমিউনিটি পুলিশিং নিষ্ক্রিয় থাকাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাশাপাশি কিছু এলাকায় বাম চরমপন্থি তৎপরতা ও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া ভোটব্যাংকও ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের বড় অংশ ঢাকা বিভাগ ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতীতে হাসিনা সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত ছিল। ওই সময় এসব এলাকায় বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এবারের নির্বাচন যাতে স্বচ্ছ, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। পেশিশক্তি ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসার, কোস্ট গার্ড ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নেবে।
এ বিষয়ে আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ঘিরে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাধারণত নেওয়া হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলায় দুই হাজার ১১৫টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৮১৩টি।
চট্টগ্রাম বিভাগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১১৩টি, কুমিল্লায় ৯৩টি, চাঁদপুরে ৬২টি, লক্ষ্মীপুরে ৫৪টি, নোয়াখালীতে ১০৬টি, ফেনীতে ৫৫টি, খাগড়াছড়িতে ৭০টি, রাঙামাটিতে ৪৫টি, বান্দরবানে ৭০টি, চট্টগ্রামে ৮৫টি এবং কক্সবাজারে ৬০টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের আওতায় দুই হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৮৫৩টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে মতিঝিলে ১০টি, বাড্ডায় ১২টি, মিরপুরে ১৫৫টি, পল্লবীতে ১২টি, ধানমন্ডিতে চারটি এবং মোহাম্মদপুরে ৫৪টি কেন্দ্র রয়েছে। এসব এলাকায় পলাতক সন্ত্রাসীদের প্রভাব থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে আগেভাগেই রেকি শুরু হয়েছে। কারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। দুর্বৃত্তদের আনাগোনা ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চলছে। ভোটের দিন এসব কেন্দ্রে কীভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হবে, সে পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশের দেড় লাখ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া হবে বডি ওর্ন ক্যামেরা। কোনো অনিয়ম বা কারচুপি হলে তা ক্যামেরায় রেকর্ড থাকবে। এতে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কমবে বলে মনে করছে পুলিশ।
গুজব রোধে বিশেষ নজর:
আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে গুজবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো ঠেকাতে সক্রিয় করা হচ্ছে সাইবার টিম। বিশেষ করে ডিএমপির সাইবার ইউনিট ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হবে। ভোটের দিন কেউ গুজব ছড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হবে। গুজব ছড়ানোদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা:
জুলাই বিপ্লবের সময় খোয়া যাওয়া অস্ত্র সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের বড় বাধা হিসেবে দেখছে পুলিশ। সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখনো এক হাজার ৩৪০টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ১১৩টি চায়না রাইফেল, একটি ৭.৬২ বোর রাইফেল, ১৩টি এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২০৭টি পিস্তল, ৪৫৫টি ৯ বোর পিস্তল, ৩৯২টি শটগান, ১২৯টি গ্যাসগান, সাতটি টিয়ারগ্যাস লঞ্চার ও দুটি সিগন্যাল পিস্তল। খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে দেশব্যাপী পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কারো কাছে এসব অস্ত্র পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, কিছু এলাকায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুষ্টিয়া, ঢাকার বাড্ডা ও মিরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও খুলনাসহ কয়েকটি জেলা এ তালিকায় রয়েছে। এসব এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।
প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ:
সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশের এসপিরা প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখবেন। কোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা হলে প্রার্থীদের দ্রুত জানানো হবে, যাতে তাদের সমর্থকেরা পুলিশকে সহযোগিতা করেন। ভোটের আগে প্রতিটি জেলায় সব প্রার্থীকে নিয়ে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে সুষ্ঠু ভোটের জন্য সবার সহযোগিতা চাওয়া হবে। একই সঙ্গে পেশিশক্তি ব্যবহারের বিষয়ে কড়া বার্তা দেওয়া হবে।

