বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত এগোচ্ছে, ততই জোরালো হচ্ছে একটি প্রশ্ন—এই নির্বাচনে কি সত্যিই সব রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পাচ্ছে? ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দলের নয়; বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) একাধিক দল একযোগে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ঘাটতি এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে কয়েকটি বিষয়—পোস্টাল ব্যালটে প্রতীকের বিন্যাস, মাঠ প্রশাসনের আচরণ, প্রার্থীদের নিরাপত্তা, মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের নিরপেক্ষতা এবং ভোটের পরিবেশ। এসব অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে একাধিক দল নির্বাচন কমিশনে গিয়েও কথা বলেছে। কিন্তু অভিযোগের সংখ্যা কমার বদলে দিন দিন যেন বাড়ছেই।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি নির্বাচনেই কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে—এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের পার্থক্য হলো, অভিযোগগুলো এসেছে খুব শুরু থেকেই। সাধারণত ভোটের দিন ঘনিয়ে এলে বা শেষ মুহূর্তে দলগুলো আপত্তি তোলে। কিন্তু এবার তফসিল ঘোষণার পর থেকেই একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে, যা নির্বাচন নিয়ে জনমনে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে।
সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা জেসমিন টুলী মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত কখনোই সবার পছন্দ হয় না। আইন ও বিধি মেনে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত এক পক্ষের পক্ষে গেলে অন্য পক্ষ সেটিকে পক্ষপাত হিসেবে দেখে। তবে তিনি বলেন, অভিযোগ এলেই কমিশনের তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত নয়; বরং আইন অনুযায়ী অবস্থান ব্যাখ্যা করাই কমিশনের দায়িত্ব।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে পোস্টাল ব্যালট। বিএনপির অভিযোগ, প্রবাসী ভোটারদের জন্য পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে প্রতীকের বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে ধানের শীষ প্রতীক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়। পাঁচ কলাম ও ১৪ লাইনের দীর্ঘ ব্যালটে প্রতীকটি নিচের দিকে রাখায় ব্যালট ভাঁজ করলে সেটি স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দাবি করেন, অনেক আসনে পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রতীকের অবস্থান কোনো দলের বিপক্ষে গেলে সেটিকে নিছক কারিগরি ভুল বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক পোস্টাল ব্যালট একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মীদের কাছে থাকার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘবদ্ধভাবে ব্যালট সংগ্রহ ও ভোট দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ হলেও এসব অভিযোগের পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ইসির ভূমিকা নিয়ে।
জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে অভিযোগ করেছে, মাঠ প্রশাসনের বড় একটি অংশ নিরপেক্ষ আচরণ করছে না। দলটির দাবি, কোথাও মনোনয়ন বাতিল করা হচ্ছে, আবার কোথাও একই ধরনের ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও প্রার্থিতা বহাল রাখা হচ্ছে। এক দেশে দুই ধরনের আচরণ—এমন অভিযোগও তুলেছে দলটি।
জামায়াত নেতারা বলছেন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ জানানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে কমিশন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আবার যাঁরা আইন মেনে চলছেন, তাঁদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এতে ভোটের মাঠে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দলটির অভিযোগ, মনোনয়ন যাচাইয়ের সময় থেকেই কমিশন একপক্ষীয় আচরণ করছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দাবি করেন, নির্বাচন কমিশনের গেটের সামনেই একজন আপিলকারীর ওপর হামলা হয়েছে। তাঁর মতে, কমিশনের নাকের ডগায় যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা আরও গভীর হওয়াই স্বাভাবিক।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি ব্যক্তিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বদলে কমিশন নানা ফাঁকফোকর দিয়ে তাঁদের বৈধতা দেওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু একটি দলের জন্য নয়, পুরো নির্বাচনব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের জন্যই অশনিসংকেত।
কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগ আসবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে অভিযোগ নির্দিষ্ট না হলে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ঢালাও অভিযোগের বদলে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে কমিশনের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।
নির্বাচন কমিশনের সামনে ঘটে যাওয়া মারধরের ঘটনায় ইসি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকায় বিষয়টি জটিল হয়ে আছে বলে জানান তিনি।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম মনে করেন, সব অভিযোগ রাজনৈতিক বলেই ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নির্বাচন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, তাই ছোট অভিযোগও অবহেলা করা উচিত নয়। তাঁর মতে, প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখে জনগণকে জানাতে পারলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা বাড়বে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু কমিশনের চোখের সামনে সহিংস ঘটনা ঘটলে সেটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলা যায় না। এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়াই কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার একমাত্র পথ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের একটি বড় পরীক্ষা। এই নির্বাচনে যদি রাজনৈতিক দলগুলো সমান সুযোগ না পায়, তাহলে ফলাফল যাই হোক না কেন—আস্থার সংকট থেকেই যাবে। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনার দায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কাঁধেই।

