বাংলাদেশের বাজারে বিশ্ববাজারের উল্টো চিত্রই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও রমজান সামনে রেখে দেশের বাজারে বেড়েছে বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দাম। আবার কিছু পণ্যে মিলেছে সামান্য স্বস্তি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চিত্র।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক মাসে দেশের বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এই বৃদ্ধি ১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অথচ একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম গত এক মাসে ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ কমেছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে এ পণ্যের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ।
রমজান সামনে রেখে বাজারে চাপ:
রোববার (২৫ জানুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে চাল, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা ও খেজুরের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজান মাসে এসব পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়।
চাল: দেশে দাম স্থির, বাইরে কম
গত এক মাসে দেশে স্বর্ণা ও চায়না জাতের মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে এই চালের দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৪ থেকে ৬০ টাকায়।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে এই মানের চালের দাম ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে প্রতি টন ৪২৩ মার্কিন ডলারে নেমেছে। যদিও গত এক মাসে বিশ্ববাজারে এই চালের দাম আবার ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়েছে।
ভোজ্যতেল: বিশ্ববাজারে পতন, দেশে ঊর্ধ্বগতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, সয়াবিন তেলের পাশাপাশি পাম অয়েলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশের বাজারে পাম অয়েলের দাম সামান্য বেড়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে পাম অয়েলের দাম কমেছে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ।
ডাল ও চিনি: মিশ্র চিত্র
মাঝারি ও ছোট দানার মসুর ডালের দাম এক বছরে দেশের বাজারে বেড়েছে। তবে মোটা দানার মসুর ডালের দাম কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় মসুর ডালের দাম কমেছে ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। ভারতে কমেছে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। বাংলাদেশের আমদানিকারকেরা মূলত এই দুই দেশ থেকেই মসুর ডাল আনেন।
চিনির ক্ষেত্রে গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত চিনির দাম ৫ শতাংশ বেড়েছে। এক মাসে বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে ১ দশমিক ২০ শতাংশ। তবে এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজার—উভয় জায়গাতেই চিনির দাম প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে।
পেঁয়াজ, ছোলা ও খেজুরে স্বস্তি:
পেঁয়াজের দামে কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে প্রতিবেদন। গত এক মাসে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কমেছে ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। বর্তমানে নতুন পেঁয়াজ ওঠার মৌসুম শুরু হওয়ায় দাম কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আদা, রসুন ও ছোলার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশের বাজারে বেশি কমেছে। রমজানে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে।
খেজুরের ক্ষেত্রেও দাম কিছুটা কমেছে। গত এক মাসে দেশের বাজারে আমদানিনির্ভর এ পণ্যের দাম ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে মানভেদে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খেজুরের দামের কোনো তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
ভোক্তারা সুফল পাচ্ছেন না কেন:
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল বাজার তদারকি, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এবং টাকার দরপতনের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের ভোক্তারা তার সুফল পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ব্যবসায়ীদের দুর্বৃত্তায়নের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও ভোক্তারা লাভবান হন না। সরকারের বাজার মনিটরিংও দুর্বল।
তিনি বলেন, যেখানে মনিটরিং হয়, সেখানেও অনেক সময় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ডলারের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখানো হলেও বাস্তবে এর প্রভাব খুব বেশি নয়। কারণ ডলারের দাম বেশ কিছুদিন ধরে স্থিতিশীল রয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ে ক্যাব উদ্বিগ্ন বলে জানান তিনি।
রমজান নিয়ে সরকারের আশ্বাস:
টাস্কফোর্স বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আসন্ন রমজানে কিছু কিছু পণ্যের দাম কমবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর নিত্যপণ্যের আমদানি ৪০ শতাংশ বেশি হয়েছে। ফলে এবারের রমজান গতবারের চেয়ে স্বস্তিদায়ক হবে।
তিনি বলেন, বাজারের সরবরাহ, আমদানি ও উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছরের রমজানে বাজার পরিস্থিতি ভালো থাকবে। টাস্কফোর্স সভায় ব্যবসায়ীরা রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। দাম বাড়বে না। বরং কিছু পণ্যের দাম আরও কমতে পারে।
সভায় বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
ভোজ্যতেল নিয়ে শঙ্কা:
তবে বাণিজ্য উপদেষ্টার আশ্বাসের মধ্যেই প্রতিবেদনে ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের তুলনায় এবছর রমজানে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কম হতে পারে।
রমজান মাসে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টন। গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ১ লাখ ৮ হাজার টন সয়াবিন তেল এবং ২ লাখ ৫৮ হাজার টন পাম অয়েলসহ মোট ৩ লাখ ৬৬ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়। আগের বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৩ লাখ ৭২ হাজার টন।
চলতি অর্থবছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সয়াবিন ও পাম অয়েল মিলিয়ে ৩ লাখ ৯২ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৫১ হাজার টন।
আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে রোজা শুরু হওয়ার কথা। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানির জন্য খোলা এলসির বিপরীতে পণ্য ফেব্রুয়ারিতে বাজারে আসবে। তবে আগের বছরের তুলনায় কম এলসি খোলায় রমজানে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

