রংপুর মহানগরে জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র–জনতার ওপর টানা তিন দিন পুলিশের ব্যাপক দমন–পীড়নের বিস্তারিত উঠে এসেছে পুলিশেরই একটি প্রতিবেদনে। ২০২৪ সালের ১৮ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে রংপুর মহানগরে পুলিশ ৬১ রাউন্ড গুলি, ১ হাজার ৫৩৯ রাউন্ড রাবার বুলেট, ৩৪৯টি টিয়ার শেল ও ৬৮টি সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। ওই প্রতিবেদনে এই হামলাকে ‘যুক্তিসংগত’ বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটি দিয়েছিলেন তৎকালীন রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মো. আবু বকর সিদ্দীক। তিনি বর্তমানে ময়মনসিংহ রেঞ্জে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) হিসেবে কর্মরত। তাঁর বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুলিশের ভেতরেই ক্ষোভ রয়েছে। যদিও দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত এখনো চলমান।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে রংপুরে পুলিশ গুলি চালায়। ওই দিন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সড়কে খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করা হয়েছিল। পুলিশের গুলির সামনে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদের ছবি পরে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আবু বকর সিদ্দীকের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ থেকে ২০ জুলাই রংপুর মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি, থানা, সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা এবং জান–মাল রক্ষায় চায়না রাইফেল দিয়ে ৫০ রাউন্ড ও এমএম পিস্তল দিয়ে ১১ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। পাশাপাশি রাবার বুলেট, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। প্রতিবেদনে এসব পদক্ষেপকে ‘যুক্তিসংগত’ বলে দাবি করা হয়।
এরপর রংপুরসহ সারা দেশে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। রংপুরে আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন হতাহত হন। এসব ঘটনার পরও যিনি হামলাকে যৌক্তিক বলে প্রতিবেদন দেন, তাঁর বিরুদ্ধেই কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তনের চেষ্টায় তাঁর ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সেই সময়ে রংপুরে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের শীর্ষ প্রায় সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হলেও আবু বকর সিদ্দীকের নাম কোনো মামলায় আসেনি। আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আরএমপির কমিশনারসহ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা আসামি হলেও সেখানেও তাঁর নাম ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, ‘ম্যানেজ’ করে তিনি আসামির তালিকা থেকে নিজের নাম বাদ দিয়ে ওই মামলায় সাক্ষী হন।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনের সময় গুলি চালানো ও গোলাবারুদ ব্যবহারের ঘটনা তদন্তে তৎকালীন আরএমপি কমিশনার ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় আবু বকর সিদ্দীককেই। তিনি ১৫ অক্টোবর ১১ পাতার একটি প্রতিবেদন কমিশনারের কাছে জমা দেন। সেখানে ছাত্র–জনতার ওপর গুলি চালানোসহ পুলিশের সব পদক্ষেপকে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ চলাকালে তিন থেকে চার হাজার আন্দোলনকারী আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দুপুর ১২টার দিকে তাজহাট থানা আক্রমণের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। বেলা দুইটার দিকে তাঁরা মডার্ন মোড় এলাকায় দুটি পুলিশ বক্সে হামলা করেন। পুলিশ নিবৃত করার চেষ্টা করলেও আন্দোলনকারীরা পিছু না হটায় আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবু বকর সিদ্দীক বলেন, তিনি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন ঠিকই, তবে সেখানে কী লেখা ছিল তা এখন তাঁর মনে নেই। তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। আবু সাঈদ হত্যা মামলায় তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
এদিকে পুলিশের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকলে পুলিশ সদর দপ্তর আবু বকরের বিরুদ্ধে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় রংপুর রেঞ্জে রিজার্ভ ফোর্সের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুর রাজ্জাককে। গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, আবু বকর সিদ্দীকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

