বাংলাদেশে প্রায় সব নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ভোটের আগে ও পরে হুমকি, সহিংসতা ও আক্রান্ত হওয়ার শিকার হচ্ছেন।
রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে এমন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে—চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ভয়ভীতি, ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের নজির রয়ে গেছে। কিছু গোষ্ঠী আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়িয়ে সহিংসতার ভয় বাড়িয়েছে।
তবে সহিংসতা ঠেকাতে বা সহিংসতাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে অপ্রতুল দেখা গেছে। এ কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এ ধরনের পরিস্থিতি ভোটকেন্দ্রে সংখ্যালঘুদের উপস্থিতি কমাতে পারে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর। গত বৃহস্পতিবার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদে সংবাদ সম্মেলনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ‘জীবন-জীবিকা-সম্পদ-সম্ভ্রমের’ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই উদ্বেগ নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সংখ্যালঘু ভোটাররা যাতে নিরাপদ ও ভয়হীন পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও কেন সংখ্যালঘুদের নির্বাচনকে ঘিরে ভয় ও আতঙ্ক থাকে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৬ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সম্প্রতি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) জানিয়েছে, এবার প্রায় ৮০টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব রাখতে পারেন।
তবে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার ও কর্মসূচিতে সংখ্যালঘুদের বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেয় না। নির্বাচনের সময় অনেক দল তাদের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায় না।
সংকট আরও প্রকট হয় যখন প্রার্থী তালিকা দেখা হয়। এবারের নির্বাচনে প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী মাত্র ৮০ জন, যার মধ্যে ১২ জন স্বতন্ত্র। ২২টি রাজনৈতিক দল সংখ্যালঘুদের থেকে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে সিপিবি ১৭ জন, বিএনপি ৬ জন এবং জামায়াতে ইসলামী ১ জন প্রার্থী দিয়েছে।
যদিও দেশের বিভিন্ন আসনে সহিংসতার কিছু ঘটনা ঘটেছে, এবারের নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করেছে। সংখ্যালঘু ভোটাররাও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উন্মুখ, কিন্তু অনেকেই দ্বিধা ও উদ্বেগে রয়েছেন। ভোট দিলে কি সমস্যা হতে পারে, না দিলে কি—এই দ্বন্দ্ব তাদের মধ্যে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারকে সংখ্যালঘু ভোটারদের শঙ্কা ও উদ্বেগ নিরসনে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নির্বাচনের আগে, চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষভাবে, যেসব আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব রাখতে পারেন, সেখানে বিশেষ নজর দিতে হবে। এছাড়া সংখ্যালঘু প্রার্থীদের ভোট প্রচারে সমান সুযোগ প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে হুমকি, সহিংসতা ও ভয়-আতঙ্কে পড়তে হয়, যা তাদের নিরাপদ ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। সূত্র: প্রথম আলো

