রাষ্ট্র সংস্কার ও একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে এবারের গণভোটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুলাই সনদকে বাস্তবে রূপ দিতে এই গণভোটকে এক ধরনের নতুন যাত্রার সূচনাবিন্দু মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কিন্তু ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রশ্ন, সংশয় আর বিভ্রান্তি। গণভোট অনুষ্ঠিত হতে আর মাত্র ১০ দিন বাকি থাকলেও এখনো এ নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি কাটেনি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রত্যাশিত মাত্রার সচেতনতা তৈরি হয়নি। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান শোনা গেলেও যে চারটি প্রশ্নের ভিত্তিতে এই ভোট, সেগুলোর ভেতরের পরিবর্তন ও প্রভাব সম্পর্কে জনমনে এখনো স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে অনেক ভোটারই বুঝে উঠতে পারছেন না—একটি ভোট আসলে কী বদলে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে সরকারের ভূমিকা ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার মধ্যে দৃশ্যমান বৈপরীত্য। একদিকে সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো পক্ষের হয়ে প্রচারে অংশ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর পাশাপাশি গণভোট-পরবর্তী ১৮০ দিনের সংসদের ভূমিকা ও কাঠামো নিয়েও চলছে নানা আলোচনা ও কৌতূহল।
গণভোটকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন অবস্থান শুরু থেকেই বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রথমে প্রশ্ন ওঠে—জাতীয় নির্বাচনের আগে না পরে গণভোট হবে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচন-পূর্ব গণভোটের পক্ষে থাকলেও বিএনপি শুরু থেকেই একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের দাবিতে অনড় ছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার একই দিনে দুই ভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপর জামায়াত ও এনসিপি প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার শুরু করে এবং বিএনপির বিরুদ্ধে ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থানের অভিযোগ তোলে। এই অভিযোগ আরও জোরালো হয়, যখন বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতা-কর্মীর ‘না’ ভোটের পক্ষে বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও পরবর্তীতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সর্বশেষ দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিলে এই বিতর্ক অনেকটাই প্রশমিত হয়। তবুও শেষ পর্যন্ত বিএনপির ভোটাররা কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা নিয়ে বিরোধী শিবিরে এখনো সংশয় রয়েছে।
গণভোটের বিষয়বস্তু জটিল হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা সহজ নয়—এমন মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। কারণ, চারটি প্রশ্নই সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত এবং প্রতিটির সঙ্গে জড়িত বহুস্তরীয় পরিবর্তন। অথচ গণভোট নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর যে ধরনের ব্যাখ্যামূলক ও ব্যাপক প্রচারণা চালানোর কথা ছিল, তা হয়নি বলেই অভিযোগ উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, জুলাই সনদে রাষ্ট্র সংস্কারের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। তাঁর মতে, এই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্যই ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, গণভোটের বিষয়টি এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হওয়ায় বিষয়টি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এখনো সময় আছে গণভোট নিয়ে জোরালো প্রচারণা চালানোর। নির্বাচনী প্রচারের পাশাপাশি প্রার্থী ও নেতাদের উচিত মানুষের কাছে গিয়ে বোঝানো—‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী পরিবর্তন আসবে, আর ‘না’ ভোটের পরিণতি কী হতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জুলাই সনদের ৪৮টি প্রস্তাবকে চারটি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, সংবিধান সংস্কারের মতো জটিল বিষয়ে শিক্ষিত ও সচেতন মানুষেরও ভাবনার প্রয়োজন হয়, সেখানে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্ত হওয়াটা স্বাভাবিক। এই অস্পষ্টতা দূর করতে আরও ব্যাখ্যা ও সচেতনতা জরুরি।
তিনি তারেক রহমানের ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর যুক্তি, যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে, সেহেতু সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই স্বাভাবিক।
গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট সহজেই জিততে পারত। কিন্তু সরকারের ভূমিকার কারণে জনগণের মধ্যে কিছুটা নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, দীর্ঘ ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কারণে এ দেশে সরকার কোনো কিছু বললে মানুষ স্বভাবতই সন্দেহের চোখে দেখে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি গণভোটে জুলাই সনদ পাস করতে চায়, সেটি দোষের নয়। কিন্তু এই চাওয়ার পক্ষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেভাবে যুক্ত করা হয়েছে, সেটি ভুল বার্তা দিয়েছে। এতে ফলাফল নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
গণভোট-পরবর্তী ১৮০ দিন নিয়ে নানা গুজব ও নেতিবাচক প্রচারণাও চলছে। একটি মহল দাবি করছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আরও ছয় মাস ক্ষমতায় থাকবে। যদিও সরকার পক্ষ থেকে এই দাবি স্পষ্টভাবে নাকচ করা হয়েছে।
২৮ জানুয়ারি এক গোলটেবিল আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ প্রথম দিন থেকেই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। পাশাপাশি সেই সংসদ ১৮০ দিন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও কাজ করবে।
১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ব্যালটে মূল প্রশ্ন থাকবে—জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর প্রতি ভোটারের সম্মতি আছে কি না। চারটি অংশ থাকলেও ভোট দিতে হবে একবারই—‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।

