ববাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতি এখন চরম উত্তাপের মধ্যে। নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীদের প্রচারণার পাশাপাশি কূটনৈতিক মহলেও চলছে চাপা ফিসফাস। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ঘুরে ফিরে একটাই প্রশ্ন: এই নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা, আর তা আদৌ কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?
এই বিতর্ক নতুন করে উসকে দেয় গত ২৫ জানুয়ারি বরগুনা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদের বক্তব্য। এক জনসভায় তিনি দাবি করেন, দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে যুক্তরাষ্ট্র নাকি এখন জামায়াতে ইসলামীর ওপর নির্ভর করেই সামনে এগোচ্ছে। এর চার দিন আগেই ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র।
দুটি ঘটনার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশের নির্বাচনে কি নতুন কোনো আন্তর্জাতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে?
এই গুঞ্জনে যুক্ত হয়েছে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিও। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. সাইমুম পারভেজ দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জামায়াতের সম্পর্কের যে আলোচনা চলছে, তা মূলত ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ের বাইরে কিছু নয়।
তবে সবাই বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখছেন না। কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার এই সম্পর্কের ইঙ্গিতকে ‘ভয়ংকর অশনিসংকেত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এটি কেবল একটি দলের সঙ্গে আরেকটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়—বরং এর ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর কৌশল।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার মূল জায়গাটি গণতন্ত্র নয়—কৌশল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডভ লেভিন কিংবা থমাস ক্যারোদার্সের গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের নির্বাচনে নাক গলায় মূলত নিজের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে।
এই স্বার্থকে সাধারণত তিনটি স্তম্ভে ভাগ করে দেখা যায়।
আজকের বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনকে দেখে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘জিরো-সাম গেম’ হিসেবে। কোনো উন্নয়নশীল দেশে যদি এমন নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসে, যারা বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের দিকে ঝুঁকতে আগ্রহী, তাহলে ওয়াশিংটন সেখানে প্রভাব হারানোর আশঙ্কা করে। দক্ষিণ এশিয়া বা আফ্রিকার নির্বাচনে তাদের অতিরিক্ত আগ্রহের পেছনে তাই সমুদ্রপথ, সামরিক সহযোগিতা ও কৌশলগত অবস্থানের হিসাব জড়িয়ে থাকে।
লিথিয়াম, কোবাল্ট কিংবা জ্বালানি সম্পদের বড় অংশই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। কোনো জাতীয়তাবাদী সরকার যদি ক্ষমতায় এসে এসব সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চায়, তাহলে মার্কিন করপোরেট স্বার্থ হুমকির মুখে পড়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত এমন ‘স্থিতিশীল ও বাজারবান্ধব’ নেতৃত্বকে সমর্থন দেয়, যারা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ বিপ্লব বা মৌলিক সংস্কারকে ভয় পায়। তাদের দৃষ্টিতে এসব পরিবর্তন অভিবাসন সংকট, নিরাপত্তা ঝুঁকি বা সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। ‘জার্নাল অব কনফ্লিক্ট রেজল্যুশন’-এর গবেষণা বলছে, কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি যখন ওয়াশিংটনের পছন্দের বাইরে যেতে শুরু করে, তখনই সে দেশের নির্বাচনে মার্কিন আগ্রহ বাড়ে।
ডভ লেভিনের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৪৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৮১ বার বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে। কখনো অর্থায়নের মাধ্যমে, কখনো ভীতিমূলক প্রচারে, আবার কখনো আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধের হুমকি দিয়ে ভোটারদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে।
চিলি থেকে নিকারাগুয়া—ইতিহাসে এসব উদাহরণ নতুন নয়। বিরোধী দলগুলোকে একত্র করা, এনজিওর মাধ্যমে সমান্তরাল ভোট গণনা, কিংবা নির্বাচনী ফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা—সবই সেই পরিচিত ‘টুলবক্স’-এর অংশ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের পথ মূলত তিনটি—প্রকাশ্য সহায়তা, আধা-প্রকাশ্য কূটনীতি এবং গোপন তৎপরতা।
ইউএসএইড বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন বা ভোটার সচেতনতায় অর্থ দেওয়া হয়, যা বাইরে থেকে নিরপেক্ষ মনে হলেও সমালোচকদের মতে এর মধ্যেও কৌশল কাজ করে। এনইডির মতো সংস্থার মাধ্যমে এনজিও ও গণমাধ্যমে অর্থায়ন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন আছে।
সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত হলো গোপন তৎপরতা। অতীতে বিদেশি অর্থায়নের মাধ্যমে আন্দোলন বা নির্বাচনী সমীকরণ বদলের অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। তাই ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগেও এমন কোনো ‘নীরব খেলা’ চলছে কি না—তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক চাপ, ভিসানীতি, শ্রম অধিকার বা নিষেধাজ্ঞার হুমকির মতো পদ্ধতি বেশি ব্যবহার করছে। অনেকেই মনে করছেন, এসবের মাধ্যমে সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষের ওপরই এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তবে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও আছে। বিদেশি প্রভাব স্পষ্ট হলে জনগণের চোখে নির্বাচিত নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে—এই দেশের মানুষ বাইরের খবরদারি সহজে মেনে নেয় না।
বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন কি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াই, নাকি এর পেছনে আন্তর্জাতিক কৌশলের অদৃশ্য হাত কাজ করছে? উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের পরীক্ষাও।

