ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী নতুন এমপিদের শপথ অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ সচিবালয় এখন উপযুক্ত ব্যক্তির খোঁজে নেমেছে কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী, এ শপথ পড়ানো হচ্ছে আগের সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব।
গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর অভ্যুত্থানের পর শিরীন শারমিন চৌধুরী স্পিকার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। আর বিগত সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং তিনি এখনো পদত্যাগ করেননি। সংবিধানের ৭৪ (৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন স্পিকার কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে নিজ পদে বহাল ধরা হবে। এই পরিস্থিতিতে এমপিদের শপথ অনুষ্ঠান কে করাবেন, তা নিয়ে সংসদ সচিবালয়ে আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২৮ জানুয়ারি, সংসদ সচিবালয় নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পাঠের বিষয়ে মতামত চেয়ে সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কাছে নথি পাঠিয়েছে। উপদেষ্টার অনুমোদন পেলে তা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হবে। এরপর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির সম্মতি মিললেই আদেশ জারি হবে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ অনুষ্ঠানের কাজ এখন প্রক্রিয়াধীন। শপথ কে পড়াবেন, তা সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে।”
সংবিধানে কী আছে:
সংবিধানের ১৪৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিদায়ী স্পিকার নতুন এমপিদের শপথ করাবেন। ১৪৮ (২) অনুচ্ছেদে স্পিকারের মনোনীত কোনো ব্যক্তিকেও শপথ করানোর অনুমতি আছে। ১৪৮ (২ক) অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে যদি স্পিকার বা তার মনোনীত ব্যক্তি শপথ না করান, তাহলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমপিদের শপথ করাবেন।
সংবিধানের এই নিয়ম অনুযায়ী, পদত্যাগ সত্ত্বেও বিদায়ী স্পিকারই এমপিদের শপথ করানোর দায়িত্বে থাকেন। ব্যর্থ হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তিন দিনের মধ্যে শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করবেন।
এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হচ্ছে। যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হবে। এজন্য এমপিদের আলাদাভাবে শপথ নিতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যরা শপথ কীভাবে নিবেন, জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রিয়াজ বলেন, “যিনি সংসদ সদস্যদের শপথ করাবেন, তিনিই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদেরও শপথ পড়াবেন।”
স্পিকার পদত্যাগ, ডেপুটি স্পিকার কারাগারে:
সংবিধানের ৭৪ (২) অনুচ্ছেদে স্পিকার পদত্যাগ ও অপসারণের নিয়ম আছে। স্পিকার রাষ্ট্রপতির কাছে স্বাক্ষরিত পত্র জমা দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। ৭৪ (৬) অনুযায়ী, পদত্যাগ বা সংসদ ভাঙা হলেও নতুন স্পিকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বিদায়ী স্পিকারকে পদে বহাল ধরা হবে।
ডেপুটি স্পিকার ৭৪ (৩) অনুযায়ী স্পিকারের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে শামসুল হক টুকু বর্তমানে পল্টন থানার মামলায় কারাগারে রয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা:
দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগের পর, সংসদ সচিবালয় পরিচালনার জন্য ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, সংসদ সচিবালয়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক দায়িত্ব সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার হাতে থাকবে, সংসদ কার্য-সংক্রান্ত দায়িত্ব ব্যতীত।
এ অনুযায়ী একটি কমিশনও গঠন করা হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব এবং অর্থ বিভাগের সচিব। তারা সংসদ সচিবালয়ের প্রশাসনিক ও আনুষঙ্গিক কাজ করছেন।
উপদেষ্টা পরিষদের সূত্র জানায়, সংসদ সচিবালয় যেসব নথি উত্থাপন করেছে, তার ভিত্তিতে সরকার এখন শপথ অনুষ্ঠানের ‘উপযুক্ত ব্যক্তি’ ঠিক করবে। এই তালিকায় সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নামও রয়েছে।

