চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা আগামীকাল (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহারের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগও কামনা করেছেন।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে ধর্মঘট শুরু হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া খোলা চিঠিতে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর নেতারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বিইএফ সভাপতি ফজলে করিম এহসান, বিজিএমইএ-র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।
নেতৃবৃন্দ চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘জাতীয় অর্থনীতির প্রাণভোমরা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দেশের মোট কন্টেইনার যাতায়াতের ৯৯ শতাংশ এবং সমুদ্রপথের বাণিজ্যের ৭৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে হয়। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। এছাড়া রমজান মাসের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকটও তৈরি হতে পারে।
তারা আরও সতর্ক করেছেন যে, জাহাজ জট এবং পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে আমদানিকারকদের বিশাল ক্ষতিপূরণ গুনতে হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
চিঠিতে ব্যবসায়ীরা ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রশংসা করেছেন। তবে বন্দরের ‘গভীর অচলাবস্থা’ তাদের উদ্বিগ্ন করেছে।
সংকটের মূল কারণ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর কাছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে শ্রমিক-কর্মচারীরা আগামীকাল থেকে টার্মিনাল ও আউটার অ্যাঙ্করেজে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, গত সাত দিন ধরে বিভিন্ন অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার পরও কোনো সমাধান হয়নি। বরং আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও তদন্ত শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যেকোনো ব্যাঘাত কাম্য নয়।’
তারা প্রধান উপদেষ্টাকে শ্রমিক, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমঝোতা তৈরির জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে আলোচনার পর শ্রমিকরা ৪৮ ঘণ্টার জন্য ধর্মঘট স্থগিত করেছিল। কিন্তু লিজ বাতিল, বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণ এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি না মানায় তারা পুনরায় ধর্মঘটে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বদলি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে।
রপ্তানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে বিদেশের বাজারে অর্ডার বাতিল, শিপমেন্টে বিলম্ব এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ ধর্মঘটকে জাতীয় বাণিজ্যে বিঘ্নের চেষ্টা হিসেবে দেখছে এবং কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের এই সংবেদনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী সমাজ মনে করছে, প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপই একমাত্র সমাধান হতে পারে।

