অন্তর্বর্তী সরকার তার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাসে দেশের বিভিন্ন খাতে যে সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে, তার সারসংক্ষেপ তুলে ধরতে ‘রিফর্ম বুক’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছে। বইটিতে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া নতুন ও সংশোধিত আইন, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন এবং কার্যকর উদ্যোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রেস উইংয়ের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাসে সরকার প্রায় ১৩০টি আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে এবং ৬০০টিরও বেশি নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ সংস্কার ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে তরুণ-তরুণীদের নেতৃত্বে লাখো মানুষ ‘আর নয়’ স্লোগান নিয়ে রাজপথে নেমে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশ চরম অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে ছিল। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অপশাসনের কারণে ব্যাংকিং খাত বিপর্যস্ত, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগও রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে ছিল। ভোটারবিহীন নির্বাচন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস এবং নাগরিক সমাজের কার্যক্রম স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করে। বিভিন্ন খাতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয় এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার গ্রহণ করা হয়।
প্রেস উইং জানিয়েছে, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। জাপানের সঙ্গে চুক্তি করে প্রায় ৭,৪০০ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। চীনের সঙ্গে ঋণের মেয়াদ পুনর্নির্ধারণ, স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নতি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়েছে, এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানভিত্তিক করা হয়েছে।
জবাবদিহির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পতিত সরকারের শতাধিক রাজনীতিক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করা হয়েছে, এবং বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া চলছে। ব্যাংকিং খাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে, ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো হয়েছে এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে এক হাজার ২শরও বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে। বিশেষ কমিশনের মাধ্যমে হাজারো ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সব আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক অধীনে আনা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও যোগ্যতাভিত্তিক বিচারপতি নিয়োগ শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃস্থাপন করা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং পূর্বে বন্ধ গণমাধ্যম পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সাত মাসব্যাপী টেলিভিশন সম্প্রচারিত রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা সাংবিধানিক সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে গণভোটের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের নতুন শাসনব্যবস্থার পথে প্রথম ধাপ। যদিও ১৬ বছরের ক্ষতি ১৮ মাসে পূর্ণ করা সম্ভব নয়, তবু দেশ দৃঢ়ভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে সরে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রাজপথে দেখা সাহসিকতা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথনির্দেশক হবে।

