বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক উত্তাপের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সুশাসন নিয়ে উদ্বেগও তত গভীর হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাধিক সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, এবারের চ্যালেঞ্জ শুধু ভোট জেতা বা হারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য পরিকল্পিত ও বহুমাত্রিক কৌশল প্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি সরাসরি ‘ভোট ডাকাতি’র রাজনীতি নয়, বরং ‘বিশ্বাসহানির রাজনীতি’—যেখানে লক্ষ্য হচ্ছে ভোটারদের আস্থা নষ্ট করা, নির্বাচনকে অগোছালো ও বিতর্কিত হিসেবে উপস্থাপন করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক বার্তা পাঠানো।
চারটি বড় ঝুঁকি: গোয়েন্দা সতর্কতা কী বলছে
বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নির্বাচনের জন্য চারটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালট জালিয়াতির আশঙ্কা, মোবাইলভিত্তিক গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে সশস্ত্র গোলযোগ এবং বিদ্যুৎ নাশকতার মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিটি ঝুঁকিই সরাসরি ফল বদলানোর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর একটি জায়গায় আঘাত করে—জনমনের বিশ্বাসে।
বিশাল আয়োজন, বিশাল ঝুঁকি: সংখ্যায় নির্বাচনের পরিসর
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনের পরিসরই ঝুঁকিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। এবারের ভোটে অংশ নিচ্ছেন ১,৯৯১ জন প্রার্থী। সারা দেশে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২,৭৭৯টি। মোট ভোটার ১২,৭৭,১৮,০৮০ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬.৪৮ কোটির বেশি, নারী ভোটার ৬.২৮ কোটির বেশি এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১,২২০ জন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় আকারের নির্বাচনে কোনো একটি এলাকায় ছোট ধরনের অনিয়মও মুহূর্তের মধ্যে জাতীয় আলোচনায় পরিণত হতে পারে। একজন নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, “উচ্চ জনঘনত্বের দেশে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক বিশৃঙ্খলা খুব দ্রুত সামাজিক আতঙ্কে রূপ নেয়।”
ব্যালট জালিয়াতির শঙ্কা: ‘ডুপ্লিকেট ভোট’ কি নতুন কৌশল?
গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, কিছু দল বা গোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রিত স্থাপনায় ব্যালট সদৃশ কাগজ ছাপিয়ে তা ভোটের সময় বাক্সে ঢোকানোর চেষ্টা করতে পারে। যদিও এই অভিযোগগুলোর নির্ভরযোগ্যতা ‘মধ্যম’ হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছে, তবু বিশ্লেষকদের মতে সীমিত পরিসরেও এমন ঘটনা ঘটলে ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
এ ধরনের জালিয়াতি কীভাবে কাজ করতে পারে—তা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত ব্যালট ঢুকিয়ে ভোটের সংখ্যা বাড়ানো, গণনার সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং ফল ঘোষণার পর আইনি জটিলতা তৈরি করা হতে পারে। এ কারণেই নির্বাচন কর্মকর্তাদের ঘণ্টাভিত্তিক ভোট গণনার রেকর্ড রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
মোবাইল ফোন ও গুজবযুদ্ধ: ডিজিটাল ফ্রন্টলাইনের লড়াই
বর্তমান সময়ের নির্বাচন কেবল মাঠে সীমাবদ্ধ নয়—অনলাইনে তার চেয়েও বড় লড়াই চলছে। প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থীদের এজেন্টদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকলে, তা ব্যবহার করে ভুয়া হামলার খবর, ভোট স্থগিতের গুজব, ফলাফল বিকৃতির অভিযোগ বা উসকানিমূলক লাইভ ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, “এক মিনিটের একটি ভাইরাল গুজব পুরো উপজেলার ভোট কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে পারে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল বিভ্রান্তি এখন নির্বাচনী নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বিদ্যুৎ নাশকতা: অন্ধকারেই কি বিশৃঙ্খলা?
গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সতর্কতা এসেছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ঘিরে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় ট্রান্সফরমারে নাশকতা বা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হতে পারে।
এর সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—ভোটকক্ষে অন্ধকার, গণনায় বিলম্ব, ব্যালট ছিনতাইয়ের সুযোগ এবং আতঙ্কে ভোটারদের কেন্দ্র ছেড়ে চলে যাওয়া। এক সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, “অন্ধকার মানেই বিশৃঙ্খলা। অন্ধকারে নির্বাচন কখনোই স্বচ্ছ থাকে না।” এ কারণে বিকল্প বিদ্যুৎ ও রিচার্জেবল আলো ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।
সশস্ত্র গোলযোগ: গ্রামাঞ্চলের ‘লাঠিসোটা রাজনীতি’
কিছু এলাকায় দেশীয় অস্ত্র—লাঠি, সোটা, বল্লম—মজুদের তথ্যও পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এসব ব্যবহার করে ভোটারদের ভয় দেখানো, সংঘর্ষ উসকে দেওয়া কিংবা ভোট বন্ধ করার চেষ্টা হতে পারে। এই ঝুঁকির নির্ভরযোগ্যতা ‘উচ্চ’ হিসেবে চিহ্নিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ছোট ছোট সংঘর্ষ—যাকে তারা ‘মাইক্রো ভায়োলেন্স’ বলছেন—বড় অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
তফসিল-পরবর্তী সংঘাত: ইতোমধ্যেই উত্তেজনার চিহ্ন
নির্বাচন তফসিল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক সহিংসতার কিছু চিত্র সামনে এসেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ঘটনা ঘটেছে ৩৬টি। বিএনপি বনাম অন্যান্য দলের সংঘর্ষ ৫টি এবং বিএনপি বনাম জামায়াতের সংঘর্ষ ২৪টি। এসব ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন, প্রাণও গেছে কয়েকজনের।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা ইতোমধ্যেই জমে আছে, যা নির্বাচনের সময় বিস্ফোরক রূপ নিতে পারে।
ফল নয়, বিশ্বাসকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে
নিরাপত্তা গবেষকদের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এসব কৌশলের মূল লক্ষ্য সরাসরি ভোটের ফল বদলানো নয়। বরং ভোটার উপস্থিতি কমানো, নির্বাচনকে বিশৃঙ্খল দেখানো, ফলাফলকে বিতর্কিত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করাই আসল উদ্দেশ্য। একে তারা বলছেন ‘উপলব্ধি যুদ্ধ’—যেখানে মানুষের ধারণা ও আস্থাই প্রধান লক্ষ্য।
নতুন উদ্বেগ: ‘তেহরিক-ই-তালেবান বাংলাদেশ’ ছক?
এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে উগ্রবাদী তৎপরতার ইঙ্গিত। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে উঠে এসেছে, ‘তেহরিক-ই-তালেবান বাংলাদেশ’ নামে একটি সম্ভাব্য উগ্র নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
কেরানীগঞ্জে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণকে তদন্তকারীরা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত ইঙ্গিত দেয়, সেখানে বিস্ফোরক প্রস্তুতির কাজ চলছিল। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো—প্রায় ৮৫টি বোমা প্রস্তুত থাকার সম্ভাব্য খবর, যা একাধিক স্থানে প্রতীকী বিস্ফোরণের পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিতে পারে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, “ছোট কিন্তু ধারাবাহিক বিস্ফোরণ জনমনে বড় আতঙ্ক তৈরি করে। নির্বাচন বানচালে এটাই সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর কৌশল।”
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও ‘ডিজিটাল জিহাদ’
গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, সম্ভাব্য হামলাগুলো বড় ধ্বংসযজ্ঞের জন্য নয়। শব্দবোমা, স্বল্পমাত্রার বিস্ফোরণ, নির্বাচন অবকাঠামোতে প্রতীকী নাশকতা এবং গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরিই মূল কৌশল।
এদিকে অনলাইনেও সক্রিয় উগ্রবাদী প্রচারণা। সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচনকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা, গণতন্ত্রকে ‘কুফর’ আখ্যা দেওয়া এবং ভোট বর্জনের আহ্বান ছড়ানো হচ্ছে। সাইবার ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, “এ ধরনের আদর্শিক উসকানি ‘লোন-উলফ’ হামলার ঝুঁকি বাড়ায়।”
পুরনো নেটওয়ার্কের ছায়া ও নতুন নামের কৌশল
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পুরনো জেএমবি সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি জামিনে মুক্ত, কেউ কেউ পলাতক। বড় সংগঠন পুনর্গঠন না হলেও ছোট সেল ও সহানুভূতিশীল গোষ্ঠী অনুঘটক ভূমিকা রাখতে পারে।
‘তেহরিক-ই-তালেবান বাংলাদেশ’ নামটি আদৌ পূর্ণাঙ্গ সংগঠন, নাকি কেবল ভয়ের ব্র্যান্ডিং—তা স্পষ্ট নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের নাম অনুকরণ করে ভয় ছড়ানো একটি পরিচিত কৌশল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি ও করণীয়
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, বাড়তি টহল, ২৪ ঘণ্টার চেকপোস্ট, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট, সাইবার নজরদারি এবং উগ্রবাদী কনটেন্ট অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় আলেমদের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘণ্টাভিত্তিক ভোট এন্ট্রি ডিজিটালাইজেশন, তাৎক্ষণিক ব্যালট মিলানো, এজেন্টদের মোবাইল নিষিদ্ধ, বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, অস্ত্র উদ্ধারে আগাম অভিযান এবং গুজব মোকাবিলায় র্যাপিড ইনফো সেল গঠন—এসব পদক্ষেপ জরুরি।
ভোটকেন্দ্রে মানুষের ভিড়ই সবচেয়ে বড় জবাব
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; এটি আস্থার লড়াই। ঝুঁকি আছে, কিন্তু তা প্রতিরোধযোগ্য। প্রশাসনিক প্রস্তুতি, দ্রুত তথ্যপ্রবাহ এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ থাকলে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বাঁচে মানুষের উপস্থিতিতেই। ভোটকেন্দ্রে ভিড়—এটাই সব ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে শক্ত জবাব।

