প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য ও বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে স্পষ্ট ফাঁক রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর ভাষায়, ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। সেখানে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের সমালোচনা করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “এক ছাতার নিচে সবাই থাকবে—এমন কথা বলা হয়েছে কিন্তু বাস্তবে ছাতাই খোলা হয়নি। বৃষ্টি পড়ছে, অথচ মানুষ ভিজছে।”
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। ‘অঙ্গীকার থেকে অনুশীলন: রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি; বাংলাদেশের নির্বাচন-২০২৬’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
বর্তমান সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সংস্কার ও বিচার কার্যক্রম চালানোর যে সুযোগ ছিল, তা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তাঁর মতে, সরকারের কার্যকর শক্তি ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় রয়েছে। “এই সরকারের যাওয়ার সময় হয়েছে—আমি এ কথা বলছি এই কারণে যে, তাদের দম ফুরিয়ে এসেছে,” বলেন তিনি। তবে তিনি যোগ করেন, এখনো সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়ে গেছে—সহিংসতামুক্ত ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্রের বক্তব্যে তথ্য বিকৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচার রয়েছে, যা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত সহিংসতার প্রকৃত চিত্র আড়াল করছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত এক প্রেস কনফারেন্সের বক্তব্যের উদাহরণ তুলে ধরেন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সেখানে সরকারের ভেতরের একজন জ্ঞানী ব্যক্তি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর ৬৪৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, তবে এর মধ্যে মাত্র ৭১টি ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বলা হয়েছে। দেবপ্রিয়ের ভাষায়, এটি তথ্য বিকৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচারের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
প্রসঙ্গত, গত ১৯ জানুয়ারি পুলিশের নথি পর্যালোচনা করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। যাচাইকৃত ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর), সাধারণ ডায়েরি (জিডি), অভিযোগপত্র এবং সারা দেশের তদন্ত অগ্রগতির ভিত্তিতে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে ৭১টিতে সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়া গেছে এবং সব ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “সরকারি হিসাবেই এক বছরে সাড়ে ৬০০-এর বেশি হামলা হয়েছে। কিন্তু শুধু মন্দিরে হামলা বা প্রতিমা ভাঙাকে সাম্প্রদায়িক বলা হলো। বাকিগুলোকে জমি, ব্যবসা বা প্রতিবেশী বিরোধের ঘটনা বলা হচ্ছে। এটা অদ্ভুত যুক্তি।” তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একজন নারী আক্রান্ত হলে যেমন সেটিকে নারী নির্যাতন বলা হয়, তেমনি সংখ্যালঘু পরিচয়ের কারণেই এই জনগোষ্ঠী সহিংসতার শিকার হচ্ছে। তাঁর মতে, এসব ঘটনার প্রকৃত বিচারও হয়নি।
তিনি আরও বলেন, “যখন বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচার বিকৃতির পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন সেই সরকারের বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসে। এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই আমাদের নতুন উত্তরণের পথে যেতে হবে।” নির্বাচন প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে আরও স্পষ্ট ও প্রগতিশীল অঙ্গীকার প্রত্যাশিত ছিল। তবে যেসব অঙ্গীকার এসেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি ছিল—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এখনো সেই ঘাটতি পূরণের সুযোগ রয়েছে। নারী, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের রাজনৈতিক শক্তিসহ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। ভোটে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় বলেন, ভোট না দেওয়ার মাধ্যমে মত প্রকাশের ধারণা এই মুহূর্তে দেশের জন্য সহায়ক নয়। “ভোটই আমাদের শক্তি,” মন্তব্য করেন তিনি।
ভোটের সময় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার যদি সহিংসতাহীন একটি নির্বাচন আয়োজন করতে পারে, তাহলে বিদায়ের আগে সেটিই তাদের শেষ ভালো কাজ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারে।

