রাজধানীতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে দুটি বিদেশি পিস্তল ও ২১ রাউন্ড গুলি। অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন মো. আজগর আলী ওরফে ভোলা (৫৫), যিনি পুলিশি ধারণা অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্রের কারবারে জড়িত। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে আজগর স্বীকার করেছেন যে, ভারতের সীমান্ত থেকে যশোরের বেনাপোল হয়ে এই অস্ত্রগুলি বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল।
এর আগে, গত ১ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন টোল ঘর এলাকায় পুলিশের অভিযান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, পাঁচটি গুলি এবং দুটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। এই অভিযানে গ্রেপ্তার হন রয়েল হাসান। পুলিশ জানিয়েছে, ওই অস্ত্র ভারত থেকে সীমান্তের মনাকষা হয়ে দেশে প্রবেশ করেছিল।
উভয় ঘটনার জিজ্ঞাসাবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জানতে পেরেছেন যে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সহিংসতা চালানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব অস্ত্র দেশে আনা হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কমিশনের বিনিময়ে সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র এনে দেশে পৌঁছে দেন। এরপর এগুলো অবৈধ কারবারিদের হাতে পৌঁছে যায়, যারা এগুলো সরবরাহ করেন অসাধু রাজনৈতিক নেতা, সন্ত্রাসী, উগ্রপন্থী, ডাকাত, ভূমিদস্যু ও অন্যান্য অপরাধীদের কাছে।
নিরাপত্তাবিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, সীমান্ত ও সীমান্তবর্তী এলাকায় মাঝে মধ্যে কিছু অস্ত্র ধরা পড়ে। তবে এ ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের বড় অংশ পুলিশ ও বিজিবির নজর এড়িয়ে দেশে প্রবেশ করে। এগুলো সাধারণত নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, খুনোখুনি, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিতে ব্যবহৃত হয়।
এসব অস্ত্রের অবাধ প্রবাহ দেশের নিরাপত্তা ও নির্বাচনী পরিবেশে গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। আগামী নির্বাচনের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা শক্তিশালী করা না হলে সহিংসতার মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
সীমান্তের যেসব পয়েন্ট দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে:
বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দিয়ে এসব অস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে। সীমান্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের রহনপুর, রাঘব বাটি, গোপালপুর, মনাকষা, সোনা মসজিদ, আজমতপুর, বিলভাতিয়া; ঝিনাইদহের মহেশপুরের জুলুলী; সাতক্ষীরার কলারোয়ার তলুইগাছা; যশোরের বেনাপোল ও চৌগাছা; রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট; চুয়াডাঙ্গার দর্শনা; সাতক্ষীরার শাঁকারা; মেহেরপুর; কুমিল্লার সরাইল; বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি; কক্সবাজারের টেকনাফের খড়ের দ্বীপ ও উখিয়া; কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চরচিলামারী; সিলেটের কানাইহাট, জৈন্তাপুরের মিনাটিলা, জাফলংয়ের কাটরি; সুনামগঞ্জের ছনবাড়ি বাজার ও চারাগাঁও; দিনাজপুরের গিলবাড়ি ও মৌলভীবাজারের বড় লেখার তারাদরম সীমান্ত।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, “সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে বলেই দেশের ভেতরে প্রতিদিন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অভিযানে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে দেশের ভেতরে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের টহল ও তল্লাশিচৌকি সক্রিয় আছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, পুলিশের তৎপরতা এবং কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ থাকায়, এসব অস্ত্র জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে না।
সীমান্ত তত্ত্বাবধান জোরদার করা হয়েছে:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ঢুকছে ভারতের সীমান্তবর্তী অরক্ষিত এলাকায়। মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকাও ব্যবহার হচ্ছে অস্ত্র আনার জন্য। সীমান্তে ঢোকার পর এসব অস্ত্র চোরাকারবারিদের ডেরায় প্রথমে মজুত করা হয়। এরপর বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং অবৈধ অস্ত্র কারবারিরা এসব অস্ত্র ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করে। কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, সীমান্ত পারাপারে জড়িত অনেকেই অস্ত্র চোরাকারবারির সহযোগী। বড় চালান পার করানোর জন্য ছোট চালান পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে পুলিশ ব্যস্ত থাকায় মূল চালান নিরাপদে দেশের ভেতরে পৌঁছে যায়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা ও কারাগার থেকে ৫ হাজার ৮৪৭টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে এখনও ১ হাজার ৩৬২টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। তবে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় ২ হাজার ৩৯৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান জানান, বিজিবি মূলত সীমান্ত থেকে দেশের ভেতরের আট কিলোমিটার এলাকায় অভিযান চালায়। এই তৎপরতার কারণে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের সময় অনেক অস্ত্রের চালান ধরা পড়ছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজশাহী সীমান্তে বিজিবি দুটি বিদেশি পিস্তল, আটটি গুলি ও চারটি ম্যাগাজিনসহ মাদকদ্রব্য ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী উদ্ধার করেছে।
৩০ ডিসেম্বর, বিজিবি দিবসে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্ত দিয়ে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সীমান্তে নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কিছু অস্ত্র পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। এসব অস্ত্র নির্বাচনকালীন সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিতে ব্যবহার হয়। দেশের নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ এলাকায় অব্যাহত তৎপরতা বজায় রাখার মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে।
সীমান্ত নিরাপদ রাখতে হবে:
জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজধানীতে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ১২ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান বিন হাদিকে গুলি করা হয়। তিনি পরে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে মারা যান।
ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনার সুযোগ নিয়ে দেশে সংবাদপত্রের কার্যালয় ও মিডিয়া সংস্থার ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাশাপাশি ছায়ানট ও উদীচী এলাকায়ও হামলা চালানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র বিদেশে তৈরি।
ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডের পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’। ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত অভিযানে ১৫ হাজার ৯৩৬ জন গ্রেপ্তার হলেও পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই কম। এই সময়ে ২৩৬টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকার পোস্ট অফিস গলির একটি বাড়ি থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেহেদী হাসান ওরফে দিপুকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ দল। অভিযানে তার কাছ থেকে ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র, পিস্তল ও রিভলভার উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা মধ্যবাড্ডার বেপারিপাড়ার একটি বাড়ি থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, “পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এটি একটি বড় হুমকি। সীমান্ত দিয়ে যদি অবৈধ অস্ত্র ঢোকে, তা হুমকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে হবে। সীমান্ত সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত রাখতে পারলে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব।”
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সীমান্তে নজরদারি থাকা সত্ত্বেও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অস্ত্র ঢুকতে পারে। নির্বাচনের সময়ে এসব অস্ত্র সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ দেশকে এই ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

