অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগোনোর কথা বলা হয়েছিল—রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন। সরকার দাবি করছে, এই তিন ক্ষেত্রেই তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সাফল্যের পাশাপাশি সরকারের ভেতরের দুর্বলতা, রাজনৈতিক চাপ এবং সামাজিক অস্থিরতা এই যাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা সাফল্য দেখালেও সামাজিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিশেষ করে মব সন্ত্রাস, সংখ্যালঘু নির্যাতন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং নারীর নিরাপত্তা ও সমতার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকার রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য ১১টি আলাদা কমিশন গঠন করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গড়ে তোলে। দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তত ৩০টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে চারটি বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই।
সরকার মনে করছে, এত অল্প সময়ে এত বিস্তৃত সংস্কার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ভাষায়, “এই সময়ের মধ্যে যে মাত্রার সংস্কার হয়েছে, আগে কখনো তা দেখা যায়নি।”
তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে সরকার সংস্কারের মূল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। বিশেষ করে বিচার প্রক্রিয়ায় ‘ন্যায়বিচার না প্রতিশোধ’—এই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরকার চাইলে এড়াতে পারত।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের বিচারকে সরকারের অন্যতম প্রধান অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দেশজুড়ে দায়ের হওয়া শত শত মামলার মধ্যে অন্তত ৪৫টি মামলার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে। সরকার দাবি করছে, অতীতের তুলনায় গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, গত ১৪ মাসে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি কারাগার ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রথমদিকে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ ও আলোচনার পর অবশেষে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার পর সরকার ও বিরোধী দল যৌথভাবে নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে থেকেও নির্বাচন আয়োজন করতে পারা সরকারের একটি বড় সাফল্য।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকার দাবি করছে, তারা ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেও ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। খাদ্যপণ্যের দাম, বিশেষ করে চালের মূল্য না কমায় সাধারণ মানুষ চাপের মধ্যেই রয়েছে।
সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। গত দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মব হামলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, মাজার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।
সরকার দাবি করছে, এসব হামলার বেশিরভাগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার একদিকে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছে, অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্নে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে সরকার যে এক জটিল ও সংবেদনশীল সময় অতিক্রম করেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এই সময়ের অর্জন ও ব্যর্থতা—দুটোই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

