জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে এসেছে। ভোটের আগের দিনেও প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পৃথক সংবাদ সম্মেলনে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, যা নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনার মাত্রা স্পষ্ট করেছে।
দেড় দশকে পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর এবারের ভোটকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন হয়েছিল একতরফাভাবে, যেখানে বিএনপি, জামায়াতসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব দল অংশ নিলেও তা ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় ভোটাররা কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।
এই বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপি এখন অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে অবস্থান করছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ‘পার্শ্ব চরিত্রে’ থাকা জামায়াত সামনে এসেছে। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সংগঠক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, রাজনীতিতে ডানপন্থি দলগুলোর প্রভাব বেড়েছে এবং এই পটভূমিতেই নির্বাচনকে ঘিরে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
জামায়াত ১১ দলীয় জোট গঠন করেছে, যেখানে ইসলামপন্থি দলের উপস্থিতি বেশি। গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও এ জোটে রয়েছে। বিএনপি তাদের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও কয়েকটি ইসলামপন্থি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছে।

ভোটের আগে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে বিভিন্ন স্থানে বিপুল অর্থ উদ্ধারের ঘটনা। ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির ৭৪ লাখ টাকা নিয়ে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে আটক হন। জামায়াত এ ঘটনাকে অপতথ্য ছড়ানোর চেষ্টা বলে দাবি করে। দলের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে একটি গোষ্ঠী বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন অভিযোগ করেন, বিএনপির সম্ভাব্য বিজয় ঠেকাতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। জামায়াতের বিভিন্ন আসনে অর্থ উদ্ধারের ঘটনাকে তিনি বিচ্ছিন্ন নয় বলে উল্লেখ করেন। একই রাতে বিএনপির নেতা নজরুল ইসলাম খানও জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।
লক্ষ্মীপুরে একটি গাড়ি থেকে ১৫ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় আটক ব্যক্তিরা বিএনপি প্রার্থীর সমর্থক বলে পুলিশ জানালেও সংশ্লিষ্ট প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ করেন।
দুই দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে নির্বাচনের আগে পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাসের বিষয়টি সামনে এসেছে।
ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশসহ সব বাহিনী মাঠে রয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে, যা ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান উভয়েই শান্তিপূর্ণ ভোটের আশা প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দলগুলোর সতর্কতা এবং নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোট-পরবর্তী সময়েই বড় চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। যে দল ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও স্থবির অর্থনীতি প্রধান পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সূত্র: বিবিসি

