ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত বৃহস্পতিবার। এবারের নির্বাচনে মাত্র ৭ জন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে একই সংখ্যক নারী জয়ী হয়েছিলেন।
নির্বাচনের আগে ও চলাকালীন সময়ে নারীর প্রতি বৈষম্যপূর্ণ আচরণ ও নারীবিদ্বেষী প্রচারণা, নারীদের ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীরা।
দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়াও মূলত আগের মতোই ছিল। জুলাই আন্দোলনের পর নারী অধিকারকর্মীদের আশা ছিল, নারীদের মনোনয়ন হারে বৃদ্ধি হবে। তবে দলগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় ৫ শতাংশ নারীর মনোনয়নের শর্ত মেনে হলেও সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়নি।
এবার নির্বাচনে জয়ী ৭ জন নারীর মধ্যে ছয়জন বিএনপির প্রার্থী, একজন স্বতন্ত্র। তারা হলেন:
- মানিকগঞ্জ-৩: আফরোজা খানম (বিএনপি)
- ঝালকাঠি-২: ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো (বিএনপি)
- সিলেট-২: তাহসিনা রুশদী (বিএনপি)
- নাটোর-১: ফারজানা শারমিন (বিএনপি)
- ফরিদপুর-২: শামা ওবায়েদ ইসলাম (বিএনপি)
- ফরিদপুর-৩: নায়াব ইউসুফ আহমেদ (বিএনপি)
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: রুমিন ফারহানা (স্বতন্ত্র)
রুমিন ফারহানা বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ছিলেন। বিএনপি মোট ১০ জন নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল।
সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০। সরাসরি নির্বাচিত ৭ জনকে যোগ করলে, মোট নারী সংসদ সদস্য সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৫৭। অর্থাৎ, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ১৬ শতাংশ। এবার ২৯৯টি আসনে নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৬ জন।
নারীবিদ্বেষী প্রচারণার প্রভাব
ফরিদপুর-৩ আসনের জয়ী নায়াব ইউসুফ আহমেদ বলেন, “সমাজে নারীদের প্রতি বৈষম্য রয়েছে। আমাকে অনেকেই দুর্বল ভেবেছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পদে আমি তাদের ভুল প্রমাণ করেছি। তবু সমাজের একটি অংশ এখনও আমাকে মেনে নেবে না। আমি প্রমাণ করতে চাই, আমি পুরুষদের তুলনায় বেশি কাজ করতে পারি।”
তিনি আরো বলেন, নারীর প্রতি বৈষম্য ও অপপ্রচারের কারণে নারীর সংখ্যা কম জয়ী হয়েছে। কিছু গোষ্ঠী চায়, নারীরা অন্ধকারে থাকুক।
ঢাকা–১২ আসনের গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার জানান, নির্বাচনের আগে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা ছিল অনেক বেশি। একটি দল প্রচার চালিয়েছিল, তাদের প্রধান কখনো নারী হতে পারবে না। তিনি মনে করেন, নারীদের মনোনয়ন বৃদ্ধি, সচেতনতা বৃদ্ধি ও নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করলে নারী প্রার্থীর জয়ী হওয়ার হার বাড়বে।
ইতিহাস: কোন সংসদে কত নারী ছিলেন
নির্বাচন কমিশন, খান ফাউন্ডেশনের গবেষণা প্রতিবেদন এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের নিউজলেটার অনুযায়ী:
- ১৯৭৩–৭৫: প্রথম সংসদে ১৫ জন নারী সংসদ সদস্য
- ১৯৭৯–৮২: দ্বিতীয় সংসদে ২ জন নির্বাচিত + ৩০ সংরক্ষিত = ৩২ জন
- ১৯৮৮–৯০: চতুর্থ সংসদে সংরক্ষিত আসন ছিল না, ৪ জন নির্বাচিত
- ১৯৯১–৯৫: পঞ্চম সংসদে ৫ জন নির্বাচিত সহ মোট ৩৫ জন
- ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি): ষষ্ঠ সংসদে ৩ জন সরাসরি নির্বাচিত + ৩০ সংরক্ষিত
- ১৯৯৬ (জুন): সপ্তম সংসদে ৮ জন সরাসরি নির্বাচিত = মোট ৩৮ জন
- অষ্টম জাতীয় সংসদ: ৭ সরাসরি + ৪৫ সংরক্ষিত = মোট ৫২ জন
- নবম সংসদ: ২১ জন সরাসরি নির্বাচিত; সংরক্ষিত ৫০ আসনে = মোট ৭০ জন
- দ্বাদশ–দ্বাদশ/ত্রয়োদশ নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪): ১৮, ২৩, ১৯ জন সরাসরি নির্বাচিত
নারী প্রার্থীর সংখ্যা
সংসদ সংস্কার বিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন জানান, ২০২৪ সালের তুলনায় এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে। ২০২৪ সালে ১০১ জন নারী প্রার্থী ছিলেন, এবার ৮৬ জন, যা মোট প্রার্থীর ৫ শতাংশের বেশি নয়।
নারীর তুলনায় পুরুষ প্রার্থী ২২ গুণ বেশি মনোনয়ন পেয়েছেন। জয়ী হয়েছেন ৮ শতাংশের বেশি নারী। পুরুষের তুলনায় জয়ী হয়েছেন ১৫ শতাংশ।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, নারীর সংখ্যা কম জয়ী হওয়াকে প্রমাণ হিসাবে দেখা যাবে না। আরও বেশি মনোনয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির মাধ্যমে নারী নেতৃত্ব মাঠপর্যায়ে তৈরি করা সম্ভব।

