৩৬ জুলাইয়ের যে ভোর নতুন আশার কথা বলেছিল, তার ১৯ মাস পর দাঁড়িয়ে সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। যে রাজপথ একসময় রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, যেখানে প্রাণের বিনিময়ে ইতিহাস লেখা হয়েছিল, সেই একই সড়কে আবারও লাঠির আঘাতে লুটিয়ে পড়েছে শান্তিপূর্ণ মানুষ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছে—পরিবর্তন কি কেবল মুখে, বাস্তবে নয়?
শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চ যমুনা অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা দেয়। কর্মসূচিটি ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে যমুনার সামনে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে পুলিশ লাঠিচার্জ চালায়। এতে একাধিক ব্যক্তি আহত হন।
৫ আগস্টের আগের ঘটনাগুলো নিয়ে যে সমালোচনা ছিল, তার পুনরাবৃত্তি দেখেছেন অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার স্বার্থ রক্ষা করছে—জনগণের, নাকি ক্ষমতাসীনদের?
ঘটনাস্থলে উপস্থিতদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার এবং ঢাকা আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মহিউদ্দিন রনি হামলার শিকার হন। তাদের ওপর আঘাতের ঘটনাকে অনেকে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে মহিউদ্দিন রনিকে মাটিতে ফেলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য লাঠি দিয়ে আঘাত করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন। নিরস্ত্র একজন ব্যক্তির ওপর এমন আচরণ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
এদিকে, ঘটনার সময় দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপরও হামলার অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক সাংবাদিককে ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যমুনার সামনে যা ঘটেছে, তা নিয়ে এখন নানা মহলে আলোচনা চলছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মতপ্রকাশের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয়ই আবার সামনে চলে এসেছে। ১৯ মাস আগে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, সাম্প্রতিক ঘটনা তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিষয় প্রায়ই আলোচিত—ক্ষমতার পালাবদল হলেও পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা খুব একটা বদলায় না। বিরোধীদের অভিযোগ, যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তারা নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। স্লোগানে বলা হয় ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’। তবে বাস্তবে সেই প্রতিফলন কতটা দেখা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় এক পুলিশ সদস্যের বিতর্কিত মন্তব্য—‘আয় হাদির লাশ নিয়ে যা’—নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত আচরণ নয়; বরং বাহিনীর ভেতরে দীর্ঘদিনের এক ধরনের কঠোর মানসিকতার প্রকাশ। সাধারণ নাগরিকের প্রতি সহমর্মিতা ও পেশাদার আচরণের অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সাভারে ছাত্র-জনতার লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। সে সময় ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্ন তখন তীব্রভাবে আলোচিত হয়।
কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কেবল বাহিনীর পোশাক বা বাহ্যিক পরিবর্তন কি জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৯ মাস পরও পুলিশ বাহিনীকে মানবিক ও পেশাদার কাঠামোয় রূপান্তরের দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
প্রশাসনের ভেতরে পুরোনো সংস্কৃতি ও প্রভাব এখনও সক্রিয় কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রশিক্ষণব্যবস্থায় মানসিকতার পরিবর্তন আনা। অন্যথায়, জনআস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও পুলিশি আতঙ্ক:
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে পুলিশের আচরণ নিয়ে জনগণ আতঙ্কের মধ্যেই ভোটকেন্দ্রে পৌঁছেছে। শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে লাঠিচার্জ, রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলা এবং সাংবাদিকদের লাঞ্ছনার অভিযোগ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এসব ঘটনার পর সাধারণ ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নির্বাচনকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়, বরং সবার জন্য সমান পরিবেশ তৈরি করা। যদি কোনো বাহিনীর প্রতি পক্ষপাত বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে, তবে তা সরাসরি নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেলে। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে সমালোচকরা দাবি করছেন, তা দ্রুত কমিয়ে আনা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়লে নির্বাচনী প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এ ছাড়া প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে তা শাসনব্যবস্থার জন্যও অস্বস্তিকর সংকেত। সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক দুর্বল হলে মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব পড়ে।
নিরাপদ ও জনবান্ধব পুলিশ গঠনের কৌশল:
পুলিশ বাহিনীকে সত্যিকারের জনবান্ধব রূপ দিতে হলে কেবল বদলি বা পোশাক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার। দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি, জবাবদিহির ঘাটতি এবং প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন না এলে আস্থা ফিরবে না।
বিচারের সংস্কৃতি নিশ্চিত করা:
জুলাই অভ্যুত্থানে ঘাতক হিসেবে ভূমিকার অভিযোগে যেসব পুলিশ কর্মকর্তার নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা জরুরি বলে দাবি উঠেছে। অভিযোগ দীর্ঘায়িত হলে বাহিনীর ভেতরে ভুল বার্তা যেতে পারে—অন্যায় করেও দায় এড়ানো সম্ভব। তাই স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পায়।
ফ্যাসিবাদের দোসরদের অপসারণ:
সমালোচকদের অভিযোগ, বাহিনীর ভেতরে এখনো কিছু ব্যক্তি সক্রিয়, যারা অতীতের স্বৈরতান্ত্রিক চর্চার ধারক। তাদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাধাগ্রস্ত হবে। সব মিলিয়ে, কেবল প্রশাসনিক রদবদল নয়—প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি এবং নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠাই হতে পারে আস্থা পুনর্গঠনের পথ। অন্যথায় সংকট ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
পুলিশ নিয়োগে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ:
পুলিশে ভবিষ্যৎ নিয়োগে কেবল মেধা যাচাই যথেষ্ট নয়—এমন মত জোরালো হচ্ছে। প্রার্থীর মানবিকতা, দেশপ্রেম এবং নৈতিক চরিত্র কঠোরভাবে মূল্যায়নের দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিখিত ও শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন ও ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই আরও শক্ত করতে হবে। তবেই জনআস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধের দাবি:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার না করার বিষয়ে স্পষ্ট আইনি কাঠামো ও কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান এসেছে। প্রশাসনিক স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ কমান্ড কাঠামো এবং জবাবদিহি ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন—এমন মত বিশ্লেষকদের।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বলপ্রয়োগ দিয়ে মতপ্রকাশ দমন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়। ৫ আগস্টের বর্ষাবিপ্লবের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জনতার ইচ্ছাকে বলপ্রয়োগে আটকে রাখা যায় না। তাই আস্থা ও অংশীদারিত্বভিত্তিক পুলিশিং-ই হতে পারে টেকসই পথ। পুলিশ সদস্যদের প্রতি বার্তা স্পষ্ট—তারা এই দেশেরই নাগরিক, তাদের বেতন জনগণের করের টাকায়। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জনআস্থা দীর্ঘমেয়াদি। সময় থাকতে সংযত আচরণ ও জনগণের পাশে দাঁড়ানোই হতে পারে বাহিনীর জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক পথ।
পরিশেষে বলা যায়, ১৯ মাস আগে যে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, সাম্প্রতিক ঘটনা সেই স্বপ্নকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ—সবই প্রমাণ করছে, জনমনে আস্থা ফিরে পেতে এখনও অনেক পথ পেরোতে হবে।
কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন বা প্রশাসনিক বদলি দিয়ে পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে সমাধান হবে না। প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক মানদণ্ডের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ভবিষ্যৎ পুলিশ নিয়োগে মানবিকতা ও নৈতিকতার গুরুত্ব নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বায়ত্তশাসন গড়ে তোলা, এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন—এসবই হতে পারে একমাত্র টেকসই সমাধান।
সংক্ষেপে, জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, স্বচ্ছতা, এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার ছাড়া পুলিশ বাহিনী সত্যিকারের জনবান্ধব হওয়া সম্ভব নয়। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জনগণের বিশ্বাস চিরস্থায়ী। এখন সময় আছে, পদক্ষেপ নিলেই পুলিশ আবার জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারবে, নইলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে অনিবার্য। সূত্র: শেয়ার বিজ

